দেশ ও মানুষের কথা বলে

[vc_row][vc_column]

[/vc_column][/vc_row]

আসামি ছিনতাই রোধে পুলিশি তৎপরতা

নভেম্বর ২৩, ২০২২,

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত এক বছরে পুলিশি হেফাজত থেকে সবশেষ দুই জঙ্গিসহ অন্তত ১৬ আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায়ও টনক নড়েনি পুলিশ কিংবা কারা কর্তৃপক্ষের। তবে সবশেষ ঘটনা যতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, অতীতের ঘটনাগুলোয় এতটা গুরুত্ব দিতে দেখা যায়নি। যে সুযোগে ঘটেছে জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনা।

তবে এবার টনক কিছুটা নড়েছে সংশ্লিষ্টদের। বহুমুখী তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে এখন। তবে এ তৎপরতা কতদিন চলবে— সেটাই এখন দেখার বিষয়। সবশেষ জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় করা হয়েছে একাধিক তদন্ত কমিটি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও গতকাল চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা  দেবে।

এছাড়াও কারাগার থেকে ‘সন্ত্রাসী, জঙ্গি, চাঞ্চল্যকর মামলার আসামি এবং সাজাপ্রাপ্ত বা একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত’ আসামিদের আদালতে হাজির করার সময়ও ডান্ডাবেড়ি পরানোর ব্যবস্থা নিতে কারা সদর দপ্তরে চিঠি দিয়েছেন প্রসিকিউশন পুলিশের প্রধান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন শাখা থেকে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে গতকাল মঙ্গলবার প্রসিকিউশন পুলিশের উপকমিশনার জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘জেলখানা থেকে সন্ত্রাসী, জঙ্গি, চাঞ্চল্যকর ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের আদালতে হাজির করার সময় অবশ্যই জেল কোড অনুযায়ী ডান্ডাবেড়ি পরানো অবস্থায় কোর্টে হাজির করতে হবে।

জঙ্গি ও সন্ত্রাসীসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আসামিকে আলাদা প্রিজন ভ্যানে পাঠানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’ এর আগে ঘটনার দিনই পলাতক দুই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিলে ১০ লাখ করে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। সারা দেশে জারি করা হয় ‘রেড অ্যালার্ট’। কোতোয়ালি থানায় একটি মামলাও করেছে পুলিশ। মামলায় রোববার রাতেই ১০ আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।

এদিকে ঢাকার আদালত চত্বরের নিরাপত্তা জোরদারে আদালতের হাজতখানায় যুক্ত হয়েছে ৬০টি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট। বড় সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গি আসামি আনা-নেয়ার সময় এখন থেকে পুলিশ সদস্যরা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরবেন। পুলিশ সূত্র বলছে, তাদের ৩০টি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও ৩০টি হেলমেট দেয়া হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ ও তথ্য বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দুই জঙ্গি আসামি ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনার পর থেকে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা আরও অনেক বেশি সতর্ক।’ আদালতে আরও দেখা গেছে, আসামি আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত আদালত চত্বরে ভ্রাম্যমাণ কোনো দোকানপাটও বসতে দেয়া হয়নি। আগে আদালতে ঢোকার প্রবেশপথের ফটক পুরোপুরি খোলা থাকত। তবে সোমবার থেকে পকেট দিয়ে জনগণ ঢুকছে। এমনকি কোনো ধরনের যানবাহনও ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ‘দুই জঙ্গি ছিনিয়ে নেয়ার পর থেকে আদালতে পুলিশের উপস্থিতি বেশি দেখতে পাচ্ছি। এ ধরনের নিরাপত্তা যদি সারা বছর থাকে, তাহলে বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী অনেক উপকৃত হবেন। জঙ্গি ছিনিয়ে নেয়া কিংবা অন্য কোনো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কমে যাবে।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের হাজতখানার ওসি মোহাম্মদ হাকিম বলেন, ‘আমরা আগের থেকে অনেক সতর্ক।’ পুলিশের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনার পেছনে পুলিশ সদস্যদের গাফিলতি এবং পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে জঙ্গিদের কীভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয়া হবে, সেজন্য একটা লিখিত নির্দেশনা আছে। সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকার কথা। একজন ইন্সপেক্টরের নেতৃত্বে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ফোর্স থাকবে, আগে-পিছে গাড়ি থাকবে। এক্ষেত্রে পুলিশের পক্ষ থেকে চরম গাফিলতি ছিল। নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি। আর জেল কর্তৃপক্ষও যখন পুলিশ এসকর্ট চেয়েছে, সেখানে তাদের লিখে দেয়া উচিত ছিল সে জঙ্গি, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য দরকার। এসবের কিছুই করা হয়নি। সবাই গতানুগতিক ঢিলেঢালা দায়িত্ব পালন করেছে। জঙ্গি, কিছু হতে পারে— এরকম কোনো প্রস্তুতিই ছিল না।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতপাড়ায় এমনিতেই প্রচুর পুলিশ সদস্য থাকেন। কিন্তু রোববার যখন দুই জঙ্গি পুলিশের মুখে স্প্রে দিয়ে পালিয়ে যায়, তখন তাদের কেউই ধরতে পারেনি। সেই সঙ্গে আদালতে উপস্থাপনের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়, অর্থাৎ জেলখানা থেকে গাড়িতে তোলা, গাড়ি থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়া বা আদালত থেকে গাড়িতে তোলা অথবা হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় জঙ্গি এবং দুর্ধর্ষ আসামিদের হাতকড়া এবং পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখার কথা। আসামি এসকর্ট কীভাবে করতে হয়, সেটা পুলিশের স্বাভাবিক প্রশিক্ষণের মধ্যেই থাকে। কিন্তু এখানে পেশাদারিত্বের অভাবে এটা ঘটেছে। সে সঙ্গে সেখানে তদারককারী যেসব কর্মকর্তা ছিলেন, তাদেরও দায়িত্বহীনতা কাজ করেছে।

মানবাধিকারকর্মী নিরাপত্তা বিশ্লেষক নূর খান লিটন বলছেন, বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটার পরও তা প্রতিরোধে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এসব ঘটনা ঘটার পর দু-একদিন তৎপর থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারপর পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়। সামগ্রিকভাবে একটি নজরদারি বা  পরিকল্পনা তৈরি করে কাজ করা— আমরা এসবের অভাব লক্ষ্য করেছি। এ ব্যাপারে যতটা গুরুত্ব দেয়া দরকার, সেটা হচ্ছে না। বরং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নানা কাজে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার কাজে ব্যবহার করার কারণে তাদের আসল কাজটা ঠিকমতো হয় না।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.