দেশ ও মানুষের কথা বলে

[vc_row][vc_column]

[/vc_column][/vc_row]

“ফিরে এসো”

জানুয়ারী,২২,২০২৩

“সুলেখা আক্তার শান্তা”

ভাগ্নির শোচনীয় অবস্থা দেখে খালা তাহানা চিন্তিত। তাহানা বড় বোন অহনাকে বলল, আপা রেমার যে পরিস্থিতি, ওকে
নিয়ে আমার ভাবনার শেষ নেই। কী এমন হলো যে কারণে ওর এমন পরিস্থিতি।
আমাকে জিজ্ঞেস করিস? আমি কী বলবো, কপালে যা লেখা ছিল তাই হয়েছে?
আপা তোমার কথায় কেমন যেন সুর।
যার মেয়ের এই অবস্থা, সে সন্তানের মায়ের কি কোন কথার সুর তাল ঠিক থাকে?
আপা তোমার এমন কান্নাকাটি আমার ভালো লাগে না। আপা তুমি দেখবে রেমা একদিন ভালো হয়ে যাবে, তুমিও সুস্থ
হবে। আমার সেবায় দেখবে তোমরা ভালো হয়ে যাবে।
অহনা তাহানার মাথার উপর হাত রেখে কষ্টের হাসি হাসলো।
আনান অফিস থেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। এমন সময় পেছন থেকে একজন ‘আনান ভাই, আনান ভাই’ বলে
দৌড়ে এলো। আনান ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল, মালেক নামে একজন ভদ্রলোক তাকে ডাকছে। কাছে গেল আনান। মালেক
বলল, ভাই ভালো আছেন?
জ্বি, আপনি কেমন আছেন?
হ্যাঁ ভাই ভালো। গতকাল ছায়মা ভাবি আমাকে ফোন করে বলল, তার ছেলেকে বিয়ে করাবে, কোন মেয়ের সন্ধান আছে
কিনা জানতে চায়।
আনান কোন উত্তর না দিয়ে ‘ও আচ্ছা আচ্ছা’ বলল।
তা আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালোই হলো, কথাটা বলতে পারলাম।
ঠিক আছে, ভাই চলি।
আচ্ছা ঠিক আছে।
মালেকের সংবাদ তার বুকে পেরেক গাঁথার মতো লাগল। দিশেহারা আনান সরাসরি চলে গেল সাব্বিরের বাসায়।
আনানকে দেখে সাব্বির এগিয়ে আসে।
ভাই যে, আসুন আসুন— বসুন এখানে ।
ভাই আমি বেশিক্ষণ বসতে পারব না, কিছু কথা বলতে এসেছি।
জ্বি ভাই বলুন।
আপনারা তাহলে ছেলেকে বিয়ে করাচ্ছেন?
সাব্বির কোন কথা বলছে না। ছায়মা ড্রইং রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল, হ্যাঁ ভাই।
একটু অপেক্ষা করলে হতো না?
অপেক্ষা আর কত?
ভাই পরে কথা বলুন, আগে নাস্তা করে নিন। মাঝখানে সাব্বির বলল।
আমি এখন কিছু্ খেতে পারব না। অন্য একদিন এসে খাবো।
ভুল বুঝবেন না, আমরা তো আপনার মেয়েকে ফেলছি না। সে যদি সুস্থ হয়, সেও সংসার করবে।
তার মানে আপনারা বুঝে গেছেন আমার মেয়ে ভালো হবে না।
তাতো আমরা বলিনি। কিন্তু অপেক্ষা আমরা আর করতে পারছি না।
ঠিক আছে, আমি তাহলে উঠি।
অর্পণদের বাড়ি থেকে বের হয়ে আনান রেমার কাছে গেল। রেমাকে ধরে বলল, তুই মারে সুস্থ হ, সুস্থ না হলে তোর যে
কপাল পুড়বে।
তাহানা বলে, দুলাভাই, আপনি ওর সাথে এমনভাবে কথা বলছেন কেন, ও কি ঠিক আছে নাকি? ও কি ইচ্ছা করে এমন
করছে? কী হয়েছে যে, কেঁদে কেঁদে এমন করে বলছেন, রেমার কপাল পুড়ছে, আমাকে বলুন।

না, কিছু না। আমার মেয়ে যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয় সেই দোয়া করো।
বাবা কী বলছে না বলছে সে বিষয়ে রেমার কোন প্রতিক্রিয়া নেই। সে তার মতো করে পাগলামি করে যাচ্ছে।
ছায়মা বেগম ছেলেকে বলে, অর্পণ মেয়ে আমরা দেখেছি। দেখতে শুনতেও ভালো, তুই কিন্তু আর না বলিস না। অর্পণ
চমকে উঠে বলে, বলো কী মা! আমার স্ত্রী আছে, আমি কেন বিয়ে করবো?
ও তো নামমাত্র স্ত্রী, শুধু কাগজেই বিয়ে হয়েছে। যাকে নিয়ে সংসার করতে পারছিস না তার সাথে কীসের কী বিয়ে? আমি
আনান সাহেবকেও বলেছি এ বিষয়ে। তার কোন দ্বিমত নেই। তার তো কোন আপত্তি নেই, তাহলে তোর কেন আপত্তি?
মা তারপরও রেমার কথা একটু ভাবো।
আমার কোন ভাবাভাবি নেই। আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি ভেবেচিন্তে নিয়েছি।
এক সময় মায়ের কথামতো বিয়েতে রাজি হতে হলো অর্পণকে। বিয়ে ঠিক হলো। বিয়ের কার্ড দিয়ে রেমাদের বাড়ি আমন্ত্রণ
করা হলো। সে কার্ড অহনার কাছে কাজের মেয়ে দিলো। তা দেখে ‘কি অর্পণ বিয়ে করছে? আমার মেয়ের সবকিছু শেষ
হলো!’— একথা বলে বিছানায় অজ্ঞান হয়ে গেল অহনা। কাজের মেয়ে ফুলি আনানকে ফোন করে সবকিছু জানাল।
আনান শুনে অফিস থেকে বাসায় ফিরে এলো। অহনাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হলো। আনান ধরে দেখল অহনার
হাত—পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। হাসপাতাল পৌঁছলে ডাক্তার পরীক্ষা—নিরীক্ষা শেষে বলল, শি ইজ ডেড, পেশেন্ট অনেক
আগেই মারা গেছে। আনান শুনে দেয়ালের সাথে মাথা ঠুকে। ডাক্তার বলেন, এ কী করছেন আপনি! মানুষ চিরজীবন
পৃথিবীতে বেঁচে থাকে না। এমন করলেও সে তো ফিরে আসবে না। আমি বুঝতে পারছি আপনার মনের অবস্থা। আপনি
শান্ত হোন।
অহনাকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলো আনান। তাহানাকে জানালে সে রেমাকে নিয়ে বাসায় এলো। আত্নীয়—স্বজন সব এলো।
অনেকে কান্নাকাটি করছে। রেমার কোন কান্না নেই। আনান রেমাকে বলল, মারে তোর মা মারা গেছে। তুই কাঁদ, তুই
কাঁদ মা কাঁদ। রেমা যে যাই বলছে, শুধু নিজের মাথার চুল ধরে টানছে। সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে, কখনো আবার
হাসছে।
আনান বলে, তুই আমার কাছে আয়, তোর মা যে নেই আর পৃথিবীতে!
রেমা এখানে ওখানে ছুটাছুটি করে। অর্পণরা সবাই এলো দেখতে। আনান বলল, দেখে যান আপনারা দেখে যান, দেখেন
পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে, প্রশান্তির ছায়া আমার জীবন থেকে চলে গেছে। আলোর উজ্জ্বল দিশারী আমার আর থাকল
না। এই বলে আনান কাঁদলো, আজ যে আমার অহনা শেষ শয্যায় শায়িত।
সাব্বির সাহেব সান্তনা দিয়ে বলেন, আপনি যদি এমনভাবে ভেঙ্গে পড়েন বৌমার কী হবে?
রেমার কী হবে জানতে চাইছেন? জেনে কী হবে বলুন? ওর যা হবার তাই হবে।
ভাই এ ব্যাপারে কারোর কিছুই করার নেই। করার থাকলে না হয় তার সমাধান করা যেত।
আনান মনে মনে বলে, মানুষের সাধ্যে যা করার থাকে তা তো করে না। বিবেকহীন মানুষকে বলে কী হবে?
অহনাকে গোসল করিয়ে জানাজা পড়ানো হলো। মাটি দিতে নিয়ে যাবে। শেষবারের মতো সবাই দেখছে। আনান বলল
রেমাকে, আয় মা তোর মাকে দেখে যা। মায়ের মুখ দেখে রেমা ‘মা’ বলে একটা চিৎকার করে উঠলো। তারপর রেমার
মুখে আর কোন সারা শব্দ নেই। অহনাকে মাটি দেয়া শেষে সবাই বাড়ি চলে এলো। অর্পণ শ্বশুরকে বলল, আমি রেমাকে
আমাদের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ওখানে থাকলে ওর ভালো লাগবে।
তাহানা রাগে ক্ষোভে নিজেকে সামলাতে না পেরে বলেই ফেলল, তোমাদের ওখানে গেলে ওর ভালো লাগবে? রেমা তোমার
বিয়ের দৃশ্য দেখতে পারবে, এটাই স্বচক্ষে রেমাকে দেখাতে চাও? আমার বোন যে মারা গেল, তা তোমার বিয়ের খবর
পেয়ে। সহ্য করতে পারেনি নিজের মেয়ের এতবড় অমঙ্গল।
ছায়মা চটে গেল। আমার ছেলেকে যার জন্য এভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে, তার জন্য কি আমার ছেলে দায়ী নাকি?
মা, বলতে পারো এর জন্যে আমরাই দায়ী।
তুই চুপ কর, তোকে আবার কে কথা বলতে বলল? আজ যদি এ পাগল মেয়েকে না নিতে চাইতি তাহলে এত কথা শুনতে
হতো? ইতিমধ্যে অনা এসে পৌঁছায়। ছায়মা বেগমের কথার প্রতিবাদ করে বলে, আপনি একথা বলছেন? রেমা আপনার

ছেলের সাথে বিয়ে হওয়ার পর থেকে পাগল হয়েছে, তার আগে থেকে নয়। আজ যদি রেমা সব হারিয়ে থাকে তা হারিয়েছে
আপনার ছেলের কাছে বিয়ে হওয়ার জন্যে, আজ আপনি আপনার ছেলেকে বিয়ে করাচ্ছেন?
এসব বিতর্ক ভালো লাগে না আনানের। অনাকে শান্ত হতে বলে— থামো তো মা অনা। আমার অহনা নেই আর তোমরা
কী শুরু করেছ?
ওনাদের বলে দিন ভালো করে, ওনারা আজ মৃত বাড়িতে এমন করতে পারেন না।
চল চল এখান থেকে তাড়াতাড়ি। সাব্বির আর অর্পণকে নিয়ে স্থান ত্যাগ করে সায়মা।
বাসায় এসে রায়হান রবিনের প্রসঙ্গে আলাপ করে। জানো লেয়া, তুমি একদিন যাকে আপন করতে পারোনি আজ সে
মস্তবড় ব্যবসায়ী।
কার কথা বলছো তুমি?
আমার ছেলে রবিন, ওর কথা বলছি।
লেয়া ভ্রম্ন ‍কুঁচকে বলে, তোমার ছেলে রবিন? ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তা বড় ব্যবসায়ী হলো কী করে? কে তাকে সাহায্য করল?
আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছে, আল্লাহ যাকে সাহায্য করে তার কোন কিছুর দরকার হয় না। অন্য কারো কাছে হাত পাতা
লাগে না।
এই আমাকে রবিনের কাছে নিয়ে যাও না। আমরা দুই সম্পত্তি এক করলে অনেক সম্পত্তির মালিক হয়ে যাবো।
তুমি কী বলতে চাচ্ছো?
আরে বুঝলে না, রবিন আর তোমার সম্পত্তি এক করলে। একথা তোমাকে আমি বলছিলাম।
ও তুমি এ আশায় বসে আছো? যাকে একদিন ছেলে হিসেবে আপন করতে পারোনি, দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছো আজ
তার সম্পত্তি তোমার চোখে পড়ে গেল?
তুমি এমনভাবে বলছো কেন? দেখবা ও আমাকে ঠিকই মা বলে ডাকবে। আমি রবিনের কাছে যাবো? চলো আমরা ওর
কাছে যাই।
আমি বুঝতে পারছি না তোমাকে কী বলা উচিৎ।
শোন ওর বয়স কম, ও ভালোমন্দ বুঝবে না— সম্পত্তি কীভাবে আগলে রাখতে হয়। মা হিসাবে আমার দায়িত্ববোধ আছে
না?
বাব্বা, তোমার আবার দায়িত্ব আছে? একথা বলছো তুমি আমার কাছে? আমার না তোমার মুখে এসব কথা শুনতে ভালো
লাগছে না।
‘হুঁ’ বলে মুখ ঝামটা মেরে বেডরুমে চলে যায় লেয়া। মানসিকভাবে আহত আর শ্রান্ত রায়হান সোফায় বসে পড়ে।
রেমার কথা ভাবে রবিন। কোথায় পাবে সে তার প্রিয়তমাকে। রবিন একা একা কথা বলে, আজ আমার সব আছে নেই
শুধু তুমি, রেমা তুমি কোথায় আছো কেমন আছো? জানি না আমার কথা তোমার মনে আছে কিনা? যেখানে আছো পরম
সুখে আছো, আমার জীবনে তোমাকে পেলাম না। সে জীবনে তুমি ছাড়া অন্য কেউ আমার জীবনসঙ্গী হতে পারবে না।
থেকে যাবো একা তোমার স্মৃতি বুকে ধারণ করে, যত স্বপ্ন ছিল দুজনে একসাথে ঘর বাঁধার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। স্বপ্ন
আর বাস্তব হতে পারল না কিছু মানুষরূপী পশুর কারণে। হায়রে মানুষ! আমরা কত কী না করতে পারি স্বার্থের জন্য।
স্বার্থ তুমি সবকিছুর মাঝে ধরা দিয়েছো।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.