দেশ ও মানুষের কথা বলে

[vc_row][vc_column]

[/vc_column][/vc_row]

“ফিরে এসো”

অক্টোবর,০৮,২০২২

“সুলেখা আক্তার শান্তা”

কয়েকদিন পরের কথা। রায়হান এখন আর বাসায় আসে না। ফোনেও যোগাযোগ করা যায় না তার সাথে। অগত্যা
শাহানা অফিসে আসে। পিয়নের কাছে জিজ্ঞেস করল, তোমার স্যার আছেন?
জি ম্যাডাম, স্যার অফিসে আছেন।
শাহানা ভাবে অফিসে আছে আর আমার সাথে যোগাযোগ করছে না। ভাবতে ভাবতে রুমে ঢোকে। ঢুকতেই দেখে
রায়হানের পাশে একটি মেয়ে বসে আছে রায়হানের হাত ধরে।
তুমি! রায়হান অবাক হয়ে যায় শাহানাকে দেখে। শাহানাও এ দৃশ্য দেখে মুহূর্তেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। রায়হান মাথায়,
চোখে মুখে পানি দেয় শাহানার। তারপর জ্ঞান ফিরে আসে। শাহানা জিজ্ঞেস করে, এই মেয়েটি কে? রায়হান কোন কথা
বলে না। শাহানা বলে, আমি আমার উত্তর পাইনি, কে এই মেয়ে?
লেয়া এবার কথা বলে, কখন থেকে বলে যাচ্ছেন— এই মেয়ে কে? এই মেয়ে কে? আমি ওর স্ত্রী আর ও আমার স্বামী।
পুরো পৃথিবী যেন শাহানার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ল। তারপর রায়হানের শার্ট ধরে বলে, এই প্রতারক! এই ছিল তোর
মনে? তুই একটা ভণ্ড, মুখোশধারী!
শাহানা অফিসে আর কথা না বাড়িয়ে বাসায় চলে এলো। বাসায় এসে দরজা বন্ধ করে চিৎকার করে কান্না করতে লাগল।
হায় আল্লাহ! আমার সব স্বপ্ন যে ভেঙ্গে গেল, আমার আর পৃথিবীতে বেঁচে থেকে কী লাভ! আমি এখন কি করব? আল্লাহ,
তুমি আমায় বলে দাও। এরই মাঝে রবিন দরজা নক করে বলে, আম্মু দরজা খোল। শাহানা দরজা খুলল। রবিন জিজ্ঞেস
করে, আম্মু তুমি কাঁদছ কেন? রবিনকে জড়িয়ে ধরে শাহানা বলে, বাবারে আমার সব শেষ হয়ে গেছে, আমার বেঁচে থাকা
যে দায়।
আম্মু বলো না, কী হয়েছে?
না বাবা, আমার কিচ্ছু হয়নি, আমি যে পৃথিবীতে তোকে নিয়ে একা হয়ে গেলাম…। শাহানা নিজেকে সামলে নেয়। ভাবে,
ছেলের সামনে আমি এভাবে কাঁদবো না। আমার ছেলেকে নিয়ে আমি একাই এ পৃথিবীতে চলব। আমি ওকে নিয়ে বাঁচব এ
পৃথিবীতে। অফিস শেষ হওয়ার পর রবিন যে সময় তার বাবাকে বাসায় দেখতে পায় সে সময় বাবাকে দেখতে না পেয়ে
‘আম্মু বাবা আসছে না কেন’ জিজ্ঞেস করে।
হ্যাঁ বাবা, আসবে তোমার বাবা।
এভাবে দুদিন যায়। রবিন দেখে তার বাবা বাসায় আসে না। দুদিন পরে রায়হান বাসায় ফিরে এলো। রবিন বাবাকে পেয়ে
খুব খুুশি। বাবাকে দৌড়ে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরল।
বাবা, তুমি কোথায় ছিলে, বাসায় আসো না কেন?
আহ্। বাবা ছাড়ো তো, ভাল লাগছে না।
রবিনের মনটা খারাপ হয়ে গেল, চুপ করে রুমে গিয়ে বসে রইল। ভাবছে, বাবা এসে তাকে আদর করবে। কিন্তু সে দেখল
বাবা তাকে উল্টো রাগ করছে। রবিন বাবার রুমে ফিরে গেল। বাবার দিকে তাকিয়ে রইল, চোখে পানি ছল ছল করছে।
ছেলের মন খারাপ আর চোখে পানি দেখে, ছেলেকে কোলে তুলে নিল রায়হান। রবিনের মুখের দিকে চেয়ে হাসি দিলো।
শাহানা কোন কথাই বলছে না রায়হানের সাথে। রায়হান তা বুঝতে পেরে শাহানার কাছে গেল। পিছন থেকে দাঁড়িয়ে
শাহানার কাঁধের উপর হাত রেখে বলল, দেখো যা হবার হয়ে গেছে। এটা নিয়ে মন খারাপ করো না। এটাকে তুমি এখন
মেনে নাও।
মেনে নিবো আমি? তার আগে তুমি আমাকে গলা টিপে হত্যা করো। আমি পারব না এসব সহ্য করতে, বুঝলে?
দেখো, কীভাবে কী হলো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমার বেলা যদি এমন হতো তুমি পারতে সহ্য করতে? বলো, বলো তুমি।
কলিং বেল বাজল। রায়হান দরজা খুলল। দরজার সামনে লেয়া দাঁড়িয়ে।
কী ব্যাপার তুমি এখানে? রায়হানকে লেয়ার প্রশ্ন।

তুমি এ বাসা চিনলে কি করে? লেয়াকে রায়হানের অবাক প্রশ্ন।
আমি অফিসের পিয়নের কাছ থেকে এ বাসার ঠিকানা নিয়েছি। এ বাসায় তো তোমার থাকার কথা নয়। আমি যেখানে
থাকব সেটাই হবে তোমার ঠিকানা।
তোমার এখানে আশা ঠিক হয়নি। এসেছ বেশ হয়েছে, কিন্তু এখানে কোন বিশৃঙ্খলা করো না।
আমি বিশৃঙ্খলা করছি? তুমি এখন এ মুহূর্তে এ বাসা থেকে বের হও।
রায়হান কোন কথা না বলে চুপচাপ বাসা থেকে বের হতে চাইল। রবিন বাবার হাত ধরে বলল, বাবা, কোথায় যাচ্ছ?
বাবা কোথায় যাচ্ছ? যেও না বাবা, তুমি যেও না।
রায়হান ছেলের সাথে কোন কথা না বলে সোজা চলে গেল। শাহানা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কোলে নিয়ে কাঁদতে লাগল। ছোট্ট
রবিন মাকে সান্তনা দিয়ে বলে, মা তুমি কেঁদো না।
পরের দিন সকালে অফিসে লেয়া। সজল বলল, দেখ লেয়া, তোকে আমি কীই বা বলব। তারপরও বলি, তোর জন্য একটা
সংসার তছনছ হয়ে যাচ্ছে, যার যতটুকু অধিকার তার ততটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকা ভালো। তার চেয়ে বেশি অধিকার
খাটানো ঠিক নয়। সজলের কথা শুনে শক্ত হয়ে যায় লেয়া। বলে, তোমার কথা এবার শেষ হয়েছে নিশ্চয়। সজল মাথা
নাড়লো। লেয়া বলে, এবার আমার কথা শোন, এই যে তুমি আমাকে বেশি উপদেশ দিতে এসেছ, আমাকে তুমি বেশি
উপদেশ দিয়ো না। তাহলে চাকরিটা হারাবে আর বউ বাচ্চার খাবার জুটবে না, বুঝলে? এটা আমার স্বামীর অফিস, চাইলে
যে কোন সময় তোমাকে অফিস থেকে ছাঁটাই করতে পারি। বলে দিলাম, মনে থাকে যেন। সজল উত্তেজিত হয়ে বলে, এই
লেয়া, তুই কী বললি, আরে আমার কারণেই তোর চাকরিটা হয়েছিল, বুঝলি? কোথায় ছিলি মনে করে দেখ, তোর মার
ঠিকমতো ওষুধ জুটত না। ঠিকমতো খেতেও পেতি না। মনে আছে সেই কথা? আজ ভুলে বসে আছিস সেসব কথা?
এজন্যই কারো ভালো করতে নেই।
আমি পিছনের কথা মনে করতে চাই না, আমি সামনের দিকে এগোতে চাই। আর তুমি এসব ব্যাপার নিয়ে আমার সাথে
কোন কথা বলবে না, বুঝলে?
হ্যাঁ, আমি এতদিন তোকে চিনতে পারিনি, এখন তো চিনলাম। তোর সাথে আমার কথা না বলাই ভালো। একটা কাপুরুষ,
ভীতু। যা বলছে এ মেয়েটা— তাই শুনে। এত ভালোবাসার সংসারটা নষ্ট করে দিচ্ছে, পারছে না তার কোন কথার উত্তর
দিতে।
রায়হান বাসায় যাচ্ছে না, কোন খোঁজ খবর নিচ্ছে না। শাহানা এবার চিন্তায় পড়ে যায়। এদিকে বাড়ি ভাড়া জমে গেছে,
ছেলের স্কুলের খরচ। রায়হানের মুখোমুখি হতে শাহানা তার অফিসে গেল। তাকে বলল, বাসায় আসো না, কোন খোঁজ
নিচ্ছো না। এদিকে বাড়িভাড়া, রবিনের স্কুলের খরচ কিছুই তো দিচ্ছ না। আমাদের মা ছেলের কাছ থেকে দূরে চলে গেলে।
তুমি সংসার খরচ থেকেও কি দূরে থাকতে চাও?
না মানে, আমার ব্যবসার অবস্থা ভালো যাচ্ছে না, তাই।
তুমি মিথ্যা কথা বলো না। আমি তোমার কাছে মিথ্যা কথা শুনতে আসিনি। তুমি তো তোমার কাছ থেকে আমাকে ছিন্ন
করে দিচ্ছ, আমার ভালোবাসা তোমার জন্য আছে, থাকবে চিরদিন।
ড্রয়ার থেকে টাকা বের করে শাহানাকে দিতে যায় রায়হান। এমন সময় লেয়া রুমে ঢোকে। হাতে টাকা দেখে বলে, কী
হচ্ছে এসব? আর এখানে কেন, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। লেয়া টাকাটা রায়হানের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বলে,
এটা একটা অফিস, এখানে যে কেউ যখন তখন আসবে না, এতে অফিসের প্রাইভেসি নষ্ট হয়। শাহানা বলে, তুমি বলছ
অফিসের প্রাইভেসি নষ্ট হয়? তোমার মুখে এসব কথা শোভা পায় না। আর তুমি আমার সাথে কখনো কোন কথা বলতে
আসবে না।
বলতে তো আমাকে হবেই, কারণ রায়হান আমার স্বামী। ওর ভালো মন্দ তো আমাকেই দেখতে হবে।
ও যদি তোমার স্বামী হয়, তাহলে ও আমার কী? এই প্রশ্নের উত্তর তোমার জানা নেই।
আমি বলছি, এ অফিসে আপনার না আসাই ভালো, ওকে না পেলেই যখন তখন অফিসে আসবেন না।
রায়হান কোন কথা বলছে না। দুচোখ মুছতে মুছতে শাহানা অফিস থেকে বের হয়ে গেল। অফিসে সবাই বিষয়টা জানল।
স্বকর্ণে শুনল, স্বচক্ষে দেখতে পেল। তাদের মন খারাপ হয়ে গেল। সবাই বলতে শুরু করল, কেউ যেন দ্বিতীয় বিয়ে না
করে।

শাহানা বাসায় ফিরে এলো, রবিন তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আম্মু বাবা আসেনি? বাবা আসবে? বাবা আসবে আজ?
ছাড় বাবা, আমি তোমার সাথে পরে কথা বলছি। শাহানা বাথরুমে ঢুকে পানির কল ছেড়ে কাঁদতে লাগল যেন ছেলে তার
কান্নার শব্দ শুনতে না পায়। এদিকে মায়ের কান্নার শব্দ রবিন ঠিকই শুনতে পেল। বুঝতে পারল তার আম্মু কান্না করছে।
আম্মুকে ডাকল সে। শাহানা বাথরুম থেকে বের হলো। রবিন জিজ্ঞেস করল, আম্মু তুমি কাঁদছ? শাহানা বলল, না বাবা,
আমি কান্না করিনি— এই বলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল, বাবা তুই আমার সব।
শাহানা কী করবে বুঝতে পারছে না। বাড়িভাড়া জমে আছে, ছেলের স্কুলের খরচ। শেষে নিজের গহনা বিক্রি করে এসব
পরিশোধ করল। এভাবেই কষ্টের মাঝে চলে যাচ্ছে মা ছেলের সংসার।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.