মার্চ ০৮, ২০২১,

বেলাল হোসেন ও মাহমুদুল হাসান

  • প্রধানমন্ত্রী আজ নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে রোল মডেল। সম্প্রতি কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেয়া শীর্ষ তিন অনুপ্রেরণীয় নারী নেতার তালিকায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। কর্মক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়নে নিজ নিজ জায়গা থেকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছেন বাংলার নারীরা। তারা এখন আর বসে নেই। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য থেকে শুরু করে দেশের নারীরা আজ স্পিকার, বিচারক, সচিব, মেজর জেনারেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, সামরিক ও পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

এছাড়াও বিমান চালনা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসা, শিল্পোদ্যোক্তা সবক্ষেত্রেই সফলতার সাথে কাজ করছেন। নারীদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে বর্তমান সরকার। প্রধানমন্ত্রী আজ নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে রোল মডেল।

সম্প্রতি কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেয়া শীর্ষ তিন অনুপ্রেরণীয় নারী নেতার তালিকায় রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২১’ উপলক্ষে দেয়া বিশেষ ঘোষণায় মহামারি চলাকালীন সফলভাবে নেতৃত্ব দেয়া শীর্ষ তিন নারী নেতার নাম ঘোষণা করেন কমনওয়েলথের মহাসচিব। বাংলাদেশে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতায়ন, বৈষম্য বিলোপ, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধি, সফল উদ্যোক্তা ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে নারীরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বর্তমানে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন তিনি। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার নিজগুনে দেশের পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। জাতীয় সংসদের প্রথম নারী স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বিশেষ দক্ষতায় কাজ করে যাচ্ছেন। পিছিয়ে নেই বিচার বিভাগেও। ক্রমেই বেড়ে চলছে নারী বিচারকদের সংখ্যা। ৪৫ বছর আগে নারী বিচারক ছিলেন মাত্র একজন। বর্তমানে নারী বিচারকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩০-এ। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে আছেন ৫২২ জন বিচারক। আর সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন আটজন নারী।

এছাড়া সরকারের প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ৯ জন নারী সচিব সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) নাসিমা বেগম ও শরিফা খান। অর্থনীতি সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহফুজা আখতার। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর (সচিব) বদরুন নেছা গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও সচিব পদমর্যাদা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুলতানা আফরোজ। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সচিব মোছা. আছিয়া খাতুন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোছা. হামিদা বেগম। বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান (সচিব) জাকিয়া সুলতানা নিজ নিজ ক্ষেত্রে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

অন্যান্য খাতের মতো দেশের স্বাস্থ্য খাতেও নারীদের অবদান কম নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে কাজ করছেন সাহান আরা বানু, এনডিসি। গেলো বছর ১৯ এপ্রিল তিনি মহাপরিচালক পদে যোগদান করেন। এ পদে যোগদানের পূর্বে তিনি অতিরিক্ত সচিব পদে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের নবম ব্যাচের কর্মকর্তা সাহান আরা বানু ১৯৯১ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। তার সুদীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন জেলা-উপজেলা ও বিভাগে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। স্বাস্থ্য খাতের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর। যেখানে গেলো বছর ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিদ্দিকা আক্তার। এর আগে তিনি স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের নার্সিং শিক্ষা বিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সিদ্দিকা আক্তারের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেছেন বিসিএসের ১১তম ব্যাচের এ কর্মকর্তা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রয়েছে মহাবিপ্লব। প্রতিষ্ঠানটিতে মাত্র দুটি অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদ। যার দুটি পদই দক্ষ নারী নেতৃত্বের হাতে। মহামারি মোকাবিলায় বিশেষ ভূমিকার জন্য তারা সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত ও সমাদৃত। তাদের মধ্যে অন্যতম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। করোনাকালে একজন অদম্য নারী হিসেবে সবার সামনে পরিচিত হন। করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলে তিনি নিজের অর্জিত জ্ঞান ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মোতাবেক সাধারণ মানুষকে সচেতন করেন। নতুন ভাইরাসটির গতিবিধি নিয়ে গবেষণাও শুরু করেন। তখন তিনি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন। এরপর তিনি পদোন্নতি পেয়ে গত বছর আগস্টে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে পদায়ন পান। প্রচারবিমুখ এই রোগতত্ত্ববিদ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ২০১৬ সালে আইইডিসিআরে পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। তারপর তিনি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মহামারি সৃষ্টিকারী ভাইরাস ও রোগ বিস্তার প্রতিরোধে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও গবেষণা শুরু করেন। তার নেতৃত্বেই ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে জিকা ভাইরাস, মধ্যপ্রাচ্যের শ্বাসযন্ত্রের সিন্ড্রোম সম্পর্কিত করোনা ভাইরাস এবং ২০১৭ সালে চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা ১৯৮৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করার পর বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। পরে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) থেকে রোগতত্ত্বে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করে তিন বছর গবেষণা করেন। তিনি নিপসমে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব দ্য ন্যাশনাল পাবলিক হেল্থ ইনস্টিটিউটের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি ফাউন্ডেশন ফর অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের ফেলো।

একই পদে আরেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবার এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা করোনা ভাইরাসের গতিবিধি নিয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করলে তিনি করোনা ভাইরাস নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সবার সামনে আসেন। প্রতিদিন গুছিয়ে গণমাধ্যমকে তথ্য দেন। মেধাবী এই নারী অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে নিজের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখার কারণে মন্ত্রণালয় তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের সভাপতি হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করে আস্থা রেখেছেন। দেশে করোনা ভাইরাসের টিকা কার্যক্রম ট্রায়াল শুরু হলে অধিদপ্তরের কোনো দায়িত্বশীল হিসেবে তিনি প্রথম ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে করোনা ভাইরাসের টিকা গ্রহণ করেন।

দেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। যার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন। তার আগে একই পদে ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন এতদিন প্রতিষ্ঠানটির ভাইরোলজি বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত বছর ১৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনের মধ্যদিয়ে তাকে এ পদে পদায়ন করা হয়। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সমাপ্ত করেন। এরপর তিনি এমফিল এবং পিএইচডি করেন। ২০১৩ সাল থেকে তিনি আইইডিসিআরে কর্মরত আছেন।

নারী উন্নয়নে সফল হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্লোবাল ওমেন সলিডার শিপ অ্যাওয়ার্ড, প্লানেট ৫০ : ৫০ চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ড, পিসট্রি ও সাউথ-সাউথ পুরস্কারে ভূষিত হন।

নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে সাফল্য : নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, উন্নয়ন, সমঅধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন নীতি, কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। যার ফলে আমাদের দেশে জেন্ডার বৈষম্য যেমন কমেছে তেমনি নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের বৈশ্বিক সূচক ও মাপকাঠিতে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীর অগ্রগতি ছিলো ৬২ শতাংশ যা ২০১৮ সালে দাঁড়িয়েছে ৭২ শতাংশে। ২০১১ সালে  বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার ছিলো ৪৬ শতাংশ যা ২০১৮ সালে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ প্রতিবেদনের হিসাবে ২০০৬ সালে ১১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো ৯১তম। ২০১৮ সালে ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। এছাড়াও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সুদূরপ্রসারী ভিশন ও মিশন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এ মন্ত্রণালয়ের ভিশন হচ্ছে জেন্ডার সমতাভিত্তিক সমাজ ও সুরক্ষিত শিশু। আর মিশন হচ্ছে নারী ও শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের সামগ্রিক উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণ।

www.bbcsangbad24.com