এপ্রিল ২৪, ২০২১,

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে অবস্থিত রানা প্লাজায় তিনটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা প্রতিদিনের মতো ২০১৩ সালের আজকের এই দিনে সকাল ৮টায় হাজির হন কর্মস্থলে। উৎপাদনও শুরু করেন নির্ধারিত সময়ে। হঠাৎ সাড়ে ৯টার দিকে বিকট শব্দ। আশপাশে উড়তে থাকে ধুলো-বালি। ধসে পড়ে রানা প্লাজা। শুরু হয় আহত শ্রমিকদের আহাজারি। উদ্ধারে এগিয়ে আসেন স্থানীয়রা। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আনসার, র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা। চলে বিরতিহীন উদ্ধার অভিযান।

ধসে পড়া আট তলা ভবনের চাপায় ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের প্রাণহানি হয়। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনায় আরও কয়েক হাজার শ্রমজীবী মানুষ আহত হন। আহতদের মধ্যে অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছেন। অনেকে আবার মানসিক রোগী হয়ে আছে।

প্রতি বছর এই দিনে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয় সাভারের বাতাস। দূর-দূরান্ত থেকে নিহত সন্তানের খোঁজে ছুটে আসেন মা-বাবা, ভাই-বোন। তারা তাদের স্বজনের কথা মনে করে রান্না প্লাজার সামনে এসে কাঁদেন অঝোরে। তেমনি কঠোর লকডাউন উপেক্ষা করে রানা প্লাজার সামনে এসেছেন এক মা।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে সন্তান হারিয়েছেন পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া এলাকার মাকসুদা বেগম। ২৪ এপ্রিল এলেই তিনি এই সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনে এসে কান্নাকাটি করেন। এবারও এসেছেন তিনি, দমাতে পারেনি কঠোর বিধিনিষেধের লকডাউন। সন্তানের জন্য চোখের পানি ফেলে দোয়া করার জন্যই এখানে ছুটে এসেছেন তিনি।

মাকসুদা বলেন, আমি বৃহস্পতিবার পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া থেকে খুব কষ্ট করে সাভারে এসেছি। আগামীকাল আবার চলে যাবো। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় মারা গেছে আমার ছেলে আল-মাসুদ। সে কোয়ালিটি সেকশনে কাজ করতো। তার জন্য দোয়া করার জন্য পিকআপ, ট্রাক ও রিকশা ভেঙে ভেঙে দীর্ঘ সময় পরে সাভারে আসি।

তিনি আরও বলেন, আমি আমার ছেলেটাকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছি। ছেলেটা আমার উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ছিল। এখন খুব কষ্টে দিন পার করছি। কেউ খোঁজ নেয় না। ক্ষতি পূরণের আশ্বাসেই কেটে গেল কত বছর। ক্ষতি পূরণ পাবো কি না জানি না? প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছি। এখন পর্যন্ত আর কোন অনুদান কিংবা ক্ষতিপূরণ পাইনি। এখানে এলে একটু শান্তি পাই। তাই কষ্ট হলেও আসি। আমার সন্তানের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।

রানা প্লাজা ধসে পড়ার দুই দিন পর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় রাবেয়া বেগমকে। প্রায় এক বছর হাসপাতালে থাকার পর তার দুই পা কেটে ফেলা হয়। সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে চলে আসেন গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরে। এরপর নতুন জীবন সংগ্রাম শুরু হয় রাবেয়ার।

৩০ বছর বয়সী রাবেয়ার বাড়ি দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে। সেদিনের দুর্ঘটনায় নিজের মাসহ পরিবারের পাঁচজনকে হারিয়েছেন তিনি। দুই পা হারিয়ে রাবেয়ার শেষ ভরসা এখন স্বামী ও দুই সন্তান। দিনাজপুরে রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় আহত নারী-পুরুষের সংখ্যা শতাধিক।

রানা প্লাজায় অবস্থিত ইথিক্স গার্মেন্টের কর্মী ছিলেন রাবেয়া। সেদিনের দুর্ঘটনার কথা মনে পড়লেই এখনও ভয়ে শিউরে ওঠেন।

রাবেয়া বলেন, যেদিন রানা প্লাজায় ফাটল ধরে, সেদিন আমরা অফিসের ভেতরেই ছিলাম। আমি সেদিন ভবনের বড় ফাটলের অংশ দেখেছিলাম। আমরা অনেকেই কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটির জন্য অনুরোধ করি। সেদিনের মতো ছুটি দিলেও পরের দিন আবার অফিসে যেতে বলা হয়।

কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে দুর্ঘটনার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন শ্রমিকরা। রাবেয়ার দাবি, এ সময় তাদের চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখায় মালিকপক্ষ। এমনকি পরের দিন কাজে না গেলে বেতন দেয়া হবে না, এমন হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।

একই কারখানায় কাজ করতেন রাবেয়ার মাও। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি। পরে মায়ের মরদেহও খুঁজে পাননি রাবেয়া।

রানা প্লাজা ধসের আট বছর পূর্তি উপলক্ষে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে করোনার পরিস্থিতিতে এবার সীমিত পরিসরে কর্মসূচির আয়োজন করেছে নিহত শ্রমিকদের পরিবার, আহত শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। শুক্রবার (২৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় মোমবাতি প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এ কর্মসূচি। শনিবার (২৪ এপ্রিল) সকালে রানা প্লাজার বেদিতে ফুল দেয়ার মাধ্যমে শেষ হয় এ কর্মসূচি।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে চারটি মামলা হয়। চারটি মামলা হলেও সেখান থেকে একটি মাত্র মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে রানা ও তার মায়ের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা নিষ্পত্তি হলেও এখন পর্যন্ত বাকি তিন মামলা নিষ্পত্তির খবর নেই। আবার হত্যা ও ইমারত আইনের রাজউকের মামলাটির এখনো সাক্ষ্যগ্রহণই শুরু হয়নি।

আট বছর আগে মামলা হলেও অভিযোগ গঠনের প্রায় পাঁচ বছর হতে যাচ্ছে। এই সময়ে হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ তো শুরু হয়নি বরং ২৫ বারের মতো সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর তারিখ পিছিয়েছে। ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন ওই মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৫ মে দিন নির্ধারণ রয়েছে।

মামলাটির কার্যক্রমের উপর দুই আসামি উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেয়ায় এর বিচার প্রক্রিয়ার জট এখনো খোলেনি। যে কারণে বিচার থেমে রয়েছে। এ বিষয়ে মামলা পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তারাও স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছে না। তবে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন।

ধসে পড়া রানা প্লাজার প্রথম তলায় ছিল বিভিন্ন দোকান। দ্বিতীয় তলায়ও ছিল দোকান আর বাংক। তৃতীয় তলার নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেডে এবং ফ্যানটম ট্যাক লিমিটেড, ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় ইথারটেক্স লিমিটেড গার্মেন্টস।

www.bbcsangbad24.com