এপ্রিল,২৫,২০২১

“সুলেখা আক্তার শান্তা”

রাহেলা একে একে সাত পুত্র সন্তানের মা হলো কিন্তু তার মেয়ে সন্তানের আফসোস
রয়ে গেল। যদি একটি মেয়ে হতো তাহলে মনের বাসনা পূর্ণ হতো আর ছেলেরাও
বোন পেত। রাহেলার গর্ভে সন্তান এলো। মহা খুশি সে। যাক এবার তাহলে মেয়ে
সন্তান হবে। অবশেষে রাহেলার মেয়ে সন্তান জন্ম হয়। আল্লাহ মেহেরবান। তিনি
তার বান্দাদের কোন আশা অপূর্ণ রাখেনা। রাহেলা মেয়ের আদর যত্ন নিয়ে খুব
মেতে থাকে। মেয়ের জন্য কি থেকে কি করবে দিশা পায়না। বছর দুয়েক পর
রাহেলার কোল জুড়ে আবার কন্যা সন্তান আসে। সন্তানটি দেখতে অনেক সুন্দর হয়
যেন সব আলো ঝলমলে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে। মেয়ের আদর করে নাম রাখা হয়
সুন্দরী। দিনে দিনে সুন্দরী যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠে। সবার কাছে তার আদরের
শেষ নাই। কেউ চুল বেঁধে দেয়, কেউ খাওয়ায়, কেউ ঘুম পাড়ায়।
সুন্দরীকে নিয়ে এতো টানাটানি মা লাহেলা সারাদিন মেয়েটাকে খুব একটা কাছে পায়
না। এক পায় রাতে ঘুমানোর সময়। রাহেলা স্বামী হাবিব বলে, তোমার তো সুবিধা
মেয়েটার পিছনে সময় দিতে হয় না। সেই সময় তুমি অন্য সন্তানদের দেখাশোনা
করতে পারো। তাতে তোমার সংসারের কাজেও সুবিধা হয়।
রাহেলা হাসতে হাসতে বলে, হয়েছে হয়েছে তুমি এবার থাম।
সুন্দরীকে সবাই ভালোবেসে কোলে নেয়। সবার মুখে একই কথা সুন্দরী মনে হয়
রাজ কপাল নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। সুন্দরীর বড় হলে স্কুলে যায়। তার বেশ
কয়েকজন সঙ্গী হয়েছে। সঙ্গীদের সঙ্গে হাসি খুশিতে মেতে থাকে।

আনন্দ উচ্ছল সেই সুন্দরী হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যায়। মেয়ের এমন পরিবর্তন
দেখে রাহেলা চিন্তিত হয়ে পড়ে। গায়ে হাত দিয়ে দেখে জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। জ্বরের
প্রকোপে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ডাক্তার বলল টাইফয়েড। বিরাট এক
সর্বনাশ করে জ্বর ভালো হলো। সুন্দরীর মুখ ও এক পা বাঁকা হয়ে যায়। অনেক
চিকিৎসায়ও সুন্দরী মুখ ও পা ভালো হয়না। রাহেলা মেয়ের এমন অবস্থা দেখে
ভেঙ্গে পড়ে। ভাবে এমন যদি মেয়ের না হয়ে তার হতো তাহলেও এতো কষ্ট হতো

না। চিকিৎসায় কোন ত্রুটি রাখেনা। কোন কিছুতেই কোন কাজ হয় না। সুন্দরী
আর সঙ্গীদের সঙ্গে খেলতে যায় না, সঙ্গীরাও তাকে আর খেলতে নেয় না। সঙ্গীরা
বলে, তোর মুখ বাঁকা পা লেংরা। সুন্দরী মন খারাপ হয়। সে আর সঙ্গীদের কাছে
যায় না।

সুন্দরী বড় হয়। মুখ আর পা বাঁকা কারণে নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকে। সঙ্গীদের
সবাইকে এড়িয়ে চলে। তার বিকলাঙ্গ নিয়ে লোকজনের কখনো কৌতুহল কখনো
কোটু দৃষ্টি। ক্রমাগত আহত হয় সে। এজন্য একা একা থাকতেই তার ভালো লাগে।
বোন এশার বিয়ে হয়েছে। এশা একদিন সুন্দরীকে বলে, তুই আমার শ্বশুরবাড়ি যাস
নেই। চল আমার সঙ্গে, কয়েকদিন বেড়িয়ে আসবি।
আপা আমার কোথাও যেতে ভালো লাগেনা। এশা বোনের এই অবস্থায় একটু হাসি
খুশি রাখতে চেষ্টা করে। সুন্দরীকে অনেক জোরাজুরি করে তার বাড়ি বেড়াতে নিয়ে
যায়। আমি না বলা পর্যন্ত তুই আর এখান থেকে যেতে পারবিনা।
আপা তুমি কি যে বলোনা। আমার পড়াশোনা আছে না।
তা আছে, তারপরও তুই এখানে থাকবি।
সুন্দরী বোনের মন রক্ষা করতে বলে, ঠিক আছে, থাকবো এখানে। এবার হলো
তো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে থাকে যেন।

এশা দেবর তাহিন সুন্দরীর কাছে এটা ওটা জিজ্ঞেস করে, সুন্দরী কখনো কোন
কথার উত্তর দেয় কখনো আবার দেয় না।
তাহিন একদিন সুন্দরীকে বলে, তুমি আমার কথার উত্তর দাও না কেন?
জবাব দেই না কারণ আপনি আমার দিকে যখন তখন তাকিয়ে থাকেন। এটা আমার
ভালো লাগেনা।
তাকিয়ে থাকি এইজন্য তুমি আমার ভালোবাসার মানুষ। আর ভালোবাসার মানুষের
দিকে তো তাকিয়েই থাকবো।
সুন্দরী অবাক হয়ে, হু আমি আবার কারো ভালোবাসা মানুষ!
তাহিন জোরে শব্দ করে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি আমার ভালোবাসার মানুষ।

আপনার কথা শুনে আমার হাসি পায়। আমার শরীরের অঙ্গ পতঙ্গ বলে দেয়, আমি
কারো ভালোবাসার মানুষ হতে পারি কি পারি না।
সুন্দরী সবচেয়ে বড় কথা, তুমি খুব শান্তশিষ্ট মানুষ। তোমার শরীর নিয়ে কথা
বলছ? আমার দৃষ্টিতে তুমি সেরা সুন্দরী। তাছাড়া তুমি খুব ভালো মনের
অধিকারী। সুন্দরী তোমাকে দেখা পর থেকে আমার হৃদয় তোমাকে ছাড়া কিছু
বোঝেনা।
আপনি কি চান এই কথাগুলো আপাকে বলে দেই?
বলো, তাতে আমার কোন সমস্যা নেই। ভাবিকে জানিয়ে দেবো আমি তোমাকে
ভালোবাসি।
আপনার মাথা ঠিক আছে? আপনি দেখতে পারছেন আমার মুখ বাঁকা পা খোঁড়া।
তারপরও আপনি আমাকে ভালবাসার কথা বলেন কিভাবে?
দেখো আমি সব দেখেশুনে তোমাকে ভালোবাসি!
আপনি অন্য মেয়ে নিয়ে সুখী হোন তাই আমি চাই।
তাহিন প্রায় অনুনয় করে বলে, কি বললে তুমি? অন্য মেয়ে হবে আমার জীবনসঙ্গী!
এটা যে আমার কল্পনাতেও আসে না। তুমি ছাড়া আমার জীবন বৃথা। ভালবাসি
আমি তোমাকে। এছাড়া আর কিছু বুঝি না।
এমন কথা শুনে সুন্দরীর বিস্মিত মুখে কোন কথা আসেনা। কি করবে তাও বুঝতে
পারে না।
আমার কথা তুমি একবার ভেবে দেখো। যেদিন দেখেছি তোমায় সেদিন থেকেই
আমি পাগলের মতো ভালোবাসি তোমাকে।
ঠিক আছে, আপনি শান্ত হোন।
শান্ত আমি তখনই হব, যখন তোমার মুখে আমার জন্য ভালোবাসার কথা শুনবো।
আমি তোমার ভালোবাসার অপেক্ষায় থাকলাম। আকস্মিক এমন ঘটনায় তোলপাড়
সুন্দরীর মন। একদিন যায় দুদিন যায় সুন্দরী নিজেকে আড়াল করে রাখে তাহিন
কাছ থাকে।

সুন্দরীর সম্মুখীন হয়ে তাহিন তার প্রশ্নের জবাব চায়। আমার কাছ থেকে  তুমি
নিজেকে আড়াল করে রাখছো কেন? যতই তুমি আমার চোখ থেকে আড়াল হও না
কেন আমার মন থেকে কখনোই তুমি নিজেকে আড়াল করতে পারবে না।
আপনি যদি আমার সঙ্গে এমন করেন তাহলে এখান থেকে আমি চলে যাব।
আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি যখন আমাকে বিশ্বাস করো না। তখন আর বেঁচে
থেকে লাভ নেই। হঠাৎ অদ্ভুত কাণ্ড করে বসে তাহিন। দেওয়ালে মাথা ঠুকে রক্তাক্ত
করে ফেলে কপাল। মাথা থেকে অঝোরে রক্ত পড়তে থাকে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় সুন্দরী
তাহিনের ক্ষতস্থান চেপে ধরতে চেষ্টা করে।
সুন্দরীর উপর ক্ষিপ্ত হয় তাহিন বলে, তুমি আমার মাথার রক্ত দেখতে পাচ্ছো কিন্তু
তুমি তো আমার অন্তরে রক্তপাত দেখতে পাচ্ছো না। যখন তুমি আমাকে
ভালোবাসো না তখন আমাকে ধরবে না।
সুন্দরী অকল্পনীয় এই ঘটনায় ভাবনায় পড়ে যায়। তাহিন আমাকে এতো ভালবাসে!
সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনা। ভালোবাসা প্রকাশে অন্তর উদ্বেলিত হয়ে
পড়ে। এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে, তাহিন আমি তোমাকে ভালোবাসি।
সত্যি বলছো তুমি আমাকে ভালোবাসো? আমাকে ছেড়ে যাবে নাতো?
না, যাব না। চলো চলো তোমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই।
না, আমার ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন নেই। এমনিতেই ভালো হয় যাবে। তোমার
যদি মায়া লাগে। তোমার ওড়না দিয়ে বেঁধে দাও। সুন্দরী তাই করে। নিজের
পরনের ওড়না ছিঁড়ে তাহিনের মাথা বেঁধে দেয়। আমার মাথার বাঁধনের মত
হৃদয়ের বাঁধনও যেন ঠিক থাকে।
হ্যাঁ, আমার হৃদয়ের ভালোবাসা শুধুই তোমার জন্য। এশা এসে অবস্থা দেখে চমকে
যায়। কিভাবে এই সর্বনাশ হলো! তাহিনকে তাড়াতাড়ি নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়।
সুন্দরী মন উড়ু উড়ু। জীবনে প্রথম প্রেমের জোয়ারে ভাসছে সে। ভালোবাসার
মানুষকে নিয়ে কল্পনায় হারিয়ে যায়। আগে যেখানে সে বোনের বাড়ি আসতে
চাইতো না এখন তার বোনের বাড়ি আপন মনে হয়।

তাহিন একদিন সুন্দরীকে প্রশ্ন করে। বলতো ভালোবাসা মানে কি? ভালোবাসা মানে
হচ্ছে, ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসা।  ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে ঘর বাঁধার
স্বপ্ন দেখা। তার মঙ্গল কামনা করা। তার চাওয়াকে পূর্ণ করা।
তাই যদি হয়। তাহলে তুমি আমার চাওয়াকে পূর্ণ করো।?
সুন্দরী আনন্দ সাথে বলে, বলো, তুমি আমার কাছে কি চাও?
আমি তোমাকে খুব আপন করে পেতে চাই।
আমি তো তোমার আপন হইয়ে আছি।
আরে এই আপন সেই আপন না। তুমি বুঝতে পারছ না আমি কি বলতে চাই?
সুন্দরী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তাহিনের দিকে। তাহিন সুন্দরী কাছে গিয়ে
জড়িয়ে ধরে। সুন্দরী ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয় তাহিনকে। ছিঃ এই তোমার
ভালোবাসা! ভালবাসাকে অপবিত্র করতে চাও? ভালোবাসার নামে বদমাশি করতে
চাও? এমন ভালোবাসা আমি চাইনা। কান্নায় ভেঙে পরে সুন্দরী। লোকজন এগিয়ে
এসে দরজা নক করে। সুন্দরী দরজা খুলে দেয়। সবার জিজ্ঞেসা সুন্দরীকে কি
হয়েছে? সুন্দরী কিছুই বলে না।
তাহিন বলে, আপনারা শোনেন, এই মেয়ে আমাকে ভালবাসার কথা বলে। দরজা
বন্ধ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে।
ভালোবাসার কথা আমি নয় আপনি বলেছেন আমাকে? সুন্দরীর ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ।
একটা পঙ্গু মেয়েকে ভালোবাসবো আমি! আপনারা দেখুন এটাকি সম্ভব?
আপনি আমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আপনার নিজের মাথা ফটান নি?
এই মেয়ে পাগল হয়ে গেছে নাকি? মুখ বাঁকা পা খোঁড়া সেই মেয়ে এসব কথা বলার
সাহস পায় কি করে! আমার দিকে তাকিয়ে দেখো? আর তুমি তোমাকে তাকিয়ে
দেখো। তাহলে বুঝতে পারবা ব্যবধান।
দেখার কি আছে আমি দেখতে কেমন তা আমি জানি। বরং আপনি আমার এই
অবস্থা দেখেও ভালোবাসার কথা বলেছেন।
এশা  সব ঘটনা শুনে নিজের বোনকে মারা শুরু করে। সবাই বলে, আরে ওকে
মারছো কেন? মারছি এইজন্য, এমন অবস্থার একটা মেয়েকে এই পরিস্থিতির
ঘটনায় সম্মুখিন করতে তার বিবেকে বাধলোনা। এশা তাহিনকে বলে, নিজের
চোখের লালসা সংযত করো।

তোমার বোনকে বলো, মানুষ স্বপ্ন দেখে কিন্তু সব স্বপ্ন বাস্তব হয়না।
স্বপ্ন স্বপ্নের মাঝে না থেকে বাস্তবে এসে ধরা দেয়। আর মানুষ স্বপ্নকে লালিত করে
সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এরপর এশা বোন সুন্দরীকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
সুন্দরীর এই ঘটনা বাড়িতে না জানালোও একপর্যায়ে বাড়ির লোকজন জেনে যায়।
সুন্দরী বিয়ে দিতে সমস্যা হয়। অনেক কষ্টে সুন্দরীর জন্য গোত্র পাওয়া যায়। কিন্তু
ছেলের দাবি তাকে পাঁচ লক্ষ টাকা দিতে হবে। পিতা হাবিব মেয়ের সমস্যার কথা
ভেবে পাঁচ লক্ষ টাকা দিতে রাজি হয়। পাঁচ লক্ষ টাকা দিয়ে বিয়ে হলোও স্বামীর
সংসারে সুন্দরীর জীবন সুন্দর হয় না। সুন্দরীর বাবা-মা একে একে দু’জনই মারা
যায়। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর ভাইবোন কেউই সুন্দরী খোঁজ খবর নেয় না।
স্বামী পলাশের মন উদাসী। পঙ্গু স্ত্রী নিয়ে সংসার করতে চায় না। এদিকে সুন্দরীর
গর্ভে সন্তান আসে। পলাশ ভয় দেখায় আমি তোর গর্ভের সন্তান মেরে ফেলবো।
পলাশ বাস্তবেও তাই করতে উদ্বত হলে একপর্যায়ে সুন্দরীকে জীবন নিয়ে পালাতে
হয়। একটি বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয় সে। সুন্দরীর সন্তান পৃথিবীতে আসে। সুন্দরী
জীবনের অপূর্ণতার মাঝেও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি খুঁজে পায়। সন্তানকে পড়ালেখা
করিয়ে মানুষের মত মানুষ করে তুলে। সুন্দরী নিজের জীবনের সব দুঃখ কষ্ট ভুলে
যায় ছেলেকে মানুষ করতে পেরে। ছেলে পাবেল সংগ্রামী মায়ের জীবন নিয়ে খুব
গর্ববোধ করে। জীবন যুদ্ধের সংগ্রামী একজন মা পেয়েছি। ছেলের ভালোবাসায়
সুন্দরী মনের সব দুঃখ কষ্ট ভুলে যায়। অপূর্ণ সুন্দরীর সুন্দর জীবন হয়।

www.bbcsangbad24.com