মে,২১,২০২১

“সুলেখা আক্তার শান্তা” 

আকাশে চাঁদ কি সুন্দর রঙ্গিন ভাবে আলো ছড়িয়ে যা উপভোগ বড় প্রশান্তিদায়ক।
গাছগুলো চারিদিকে বাতাসে দুলছে। বাতাসের শনশন শব্দ আসছে। কি যে আমার

ভালোলাগছে তা তোমাকে বলে বুঝাতে পারবোনা।

আনিতা তুমি আমার পাশে আছো বলেই তাই সবকিছু তোমার কাছে ভালো লাগছে।
রাকিব কেন তোমার ভালো লাগছে না?
হ্যাঁ লাগছে। তা মাঝে হতাশাও কাজ করছে। বেকার মানুষ পড়ালেখা শেষ করে
চাকরি পাচ্ছি না। তাও তো ভালো তোমার একটা চাকরি হয়েছে।
ভেঙ্গে পরোনা। চাকরি হয়নি হবে।

চাকরি হলে বাবা-মাকে বলতে পারতাম বিয়ের কথা।

বিয়ের জন্য এত তাড়াহুড়া করছ কেন? আস্তে ধীরে হবে বিয়ে।

তার মানে তুমি চাও না আমাদের বিয়ে হোক! রাকিব এই কথা বলে, মুখ গম্ভীর
করে অন্যদিকে ফিরিয়ে থাকে।

আমার সঙ্গে রাগ করে তুমি থাকতে পারবে?
তা পারবো না। কিন্তু আমার রাগে তোমার কি আসে যায়।
আমি ভালোবাসি তোমাকে। মনেপ্রাণে চাইও তোমাকে। আমার হৃদয়ে সেখানে তুমি
আছো অন্য কেউ নয়। রাকিব উৎসাহিত হয়ে হাসি দেয়। রাত দশটা বেজেছে
বাসায় যেতে হবে। এরই মধ্যে ফোন বেজে ওঠে। আনিতা শব্দ শুনতে পেয়ে ব্যাগ
থেকে ফোন বের করে দেখে অনেক বার ফোন এসছে, তাড়াতাড়ি ফোন রিসিভ
করে। ও প্রান্ত থেকে প্রতিবেশ  আবির কাকা।

কাকা আপনি?
আবির বিহ্বলতা ভাবে বলে। মা তুই দেশে চলে আয়।

কাকা কি হয়েছে?
তোর বাবা-মা আর পৃথিবীতে নেই! তাদেরকে খুন করা হয়েছে!

এই কথা শুনে মোবাইলটা হাত থেকে ছুড়ে মারে। আনিতা দাঁড়ানো থেকে পড়ে যায়।

রাকিবের মনে হলো নিশ্চয়ই কোন খারাপ খবর। আনিতা কি হয়েছে? আমার
বাবা-মা আর জীবিত নেই। তাদের কে খুন করা হয়েছে!
হায় সর্বনাশ! রাকিব খুব দ্রুত আনিতাকে নিয়ে গাড়ি স্টেশনে রওনা দেয়। রাকিবও
আনিতার দেশে আসে। বাড়ি পৌঁছানোর পর দেখে বাড়ি ভর্তি মানুষের ঢল নেমেছে।

দৌড়পেরে বাবা-মার মৃত লাশ জড়িয়ে ধরে কান্না। আনিতার চিৎকারে সবার চোখ
দিয়ে অশ্রু ঝরে। এই বিপদ কালে সবাই আনিতার পাশে থাকলেও পাশে নেই চাচা-
চাচী। এই মধ্যে বাড়িতে পুলিশের আগমন। তখনি হাজির আনিতার চাচা হাশেম ও
চাচী সাহিদা তারা আনিতার পাশে এসে ফিসফিস করে বলে, বল, তো বাবা-মাকে
ডাকাত খুন করেছে। এবার পুরোপুরি বোঝা হয়ে গেল আমার বাবা-মাকে আপনারা
খুন করেছেন!
বাড়াবাড়ি করবি না তাহলে তোকেও খুন করে ফেলবো।
আমি মরনেও ভয় পাইনা। বাবা-মার সঙ্গে আমারও মৃত্যু চাই।

তুই যদি মরতে চাস আমাদের প্ল্যান মত কাজ করবেকে?

বাবা-মাকে মেরেফেলে ‍এখন আমাকে হুমকি দিচ্ছেন! হাশেম আর সাহিদা দেখে
কিছুতেই থামাতে পারে না আনিতাকে। আমাদের কথা তুই শুনবি না তাহলে দেখ
এবার তোমা ভালোবাসার মানুষ কই! আনিতা চারিদিকে তাকিয়ে দেখে রাকিবকে
দেখে না। রাকিবকে খোঁজখুজি শুরু করে। একদিকে বাবা-মা হারানোর ব্যাথা
অন্যদিকে ভালোবাসার মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না। ব্যাথার উপরে ব্যাথা। ভয় পায় যদি
রাকিবের কিছু করে ফেলে। আমি আপনাদের কথায় রাজি। বাবা-মার মৃত্যুর জন্য
মামলা করব না।
তুই আগে আমাদের কথা মত কাজ কর। তারপর রাকিবকে বের করব আমরা।
গ্রামের লোকজন যদি বলে আমার বাবা-মাকে আপনারা খুন করেছেন? সেদিক
ম্যানেজ করব আমরা। আমরা যেভাবে পুলিশকে বলি তুইও সেভাবে বলবি। পুলিশ
লাশ দুটি নেওয়ার জন্য গাড়ি তুলে। আনিতা চাচা-চাচীর কথা মত পুলিশকে বলে,
বাবা-মা ডাকাতের হাতে খুন হয়েছে। আর গ্রামের কিছু টাকার লোভী মাতুব্বর
হাশেম আর সাহিদা কথা মত পুলিশের কাছে বাক্প্রণালী দেয় আনিতার বাবা-মা
ডাকাতের হাতে মারা গেছে। আনিতার বাবা মার মৃত্যুর জন্য আর মামলা করা হয়

না। হাশেম আর সাহিদা তাতে প্রফুল্ল হয়। এবার সব সম্পত্তি ভোগ করব আমরা।

এতে আর বাধা দেয় কে। আনিতা রাকিবের কথা জানতে চাই। রাকিবকে কোথায়
রেখেছেন। ওকে বের করেন।
সাহিদা বলে, ঝামেলা করার চেষ্টা করবি না। ওকে আমার তখনেই বের করব।
যখন আমার ছেলেকে তুই বিয়ে করবি। তার আগে নয়!
আমি মরে গেলেও আপনার ছেলেকে বিয়ে করব না।

তাহলে হারাবি তোর ভালোবাসার মানুষকে।
আনিতা রাকিবকে পাওয়ার জন্যে কৌশল খাটায়। হ্যাঁ আমি বিয়ে করব দুলালকে।
আগে রাকিবকে আমার সামনে হাজির করতে হবে।

বিয়ের জন্য যেসব জিনিসপএ আছে সেগুলো পড়েনে। সাহিদা তার বদ্ধ মাতাল

ছেলের সঙ্গে আনিতার বিয়ে ঠিক করে। দুলাল অকর্ম ছেলে কাজকর্ম কিছুই করেন
না। আনিতা ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার জন্য বধূ সেজে তৈরি হয়। রাকিবকে

হাজির করে, আনিতার ইশারার মাধ্যমে পালানোর কথা বলে। আনিতা আর রাকিব

পালিয়ে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকায় এসে দু’জনে প্রাণ ভরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। যাক

অবশেষে স্বস্তির পেলাম। ভাবে কি করে চাচা-চাচীর কাছ থেকে সম্পত্তি উদ্ধার করা
যায়। আনিতা সিদ্ধান্ত নেয় সম্পত্তি বিক্রি করবে। আস্তে আস্তে দেশের লোকজনের
সাথে যোগাযোগ করে। এক পর্যায়ে সম্পত্তি বিক্রি ঠিক হয়। সম্পত্তি বিক্রিতে চাচা
হাশেম আর চাচী সাহিদা বাধা দেয়। তাতে লোকজন সম্পওি কিনতে চায় না।
আনিতা বাধ্য হয়ে বসতবাড়ি জমি ক্ষেত যে দাম আছে তার চেয়ে অনেক কম
টাকায় সম্পওি বিক্রি করে। জমি বিক্রি করা সমস্ত টাকা রাকিবের হাতে তুলে দেয়।

রাকিব এই টাকা দিয়ে তুমি ব্যবসা করবে। কিন্তু রাকিব টাকা নিতে রাজি হয়না।
রাকিব তুমি আমার কাছে টাকা চাওনি। আমি তো টাকা তোমাকে স্বেচ্ছায় দিচ্ছি।
আনিতার কথা মত রাকিব টাকা নেয়। তা দিয়ে ব্যবসা শুরু করে। দিন দিন

রাকিবের ব্যবসা বড় হয়। এক সময় রাকিব বড় ব্যবসায়ী হয়। কিন্তু সে ভুলে যায়
পিছনের কথা। যে তার অতীত কেমন ছিল। দিন পরিবর্তনের সাথে রাকিবের মনও
পরিবর্তন হয়ে যায়। ভুলে যায় সে আনিতাকে।  ভালোবাসার মানুষ যে আনিতাকে
সমায় দেয় না তার সঙ্গে দেখা করে না, মনে কোন তার জন্য অভিযোগ নেই।

আনিতা ভালোবাসার মানুষকে সারপ্রাইজ দিতে চায়। আজ রাকিবের জন্মদিন।

আনিতা মনে পরিকল্পনা আজ রাকিবের অফিসে যাব। তারপর ওকে নিয়ে ঘুরবো।
রেস্টুরেন্টে খাব। অতি প্রফুল্ল মনে নিয়ে ছুটে রাকিবের অফিসে। অফিসে এসে দেখে
রাকিব অফিসে নেই। অফিসে আছে শুধু দারোয়ান। দারয়ানের কাছে জিজ্ঞাস করে,
রাকিব কোথায়? আর অফিসের লোকজন কোথায়?
দারোয়ান বলে, ম্যাডাম আজ তো স্যারের জন্মদিন। তাই অফিসের সবার ছুটি,
সবাইকে নিয়ে স্যার তার বাসায় জন্মদিন পালন করছে। আনিতা এতে চমকিত হয়ে
হয়ে যায়। দারোয়ানকে আর কোন কথা না বলে, চুপচাপ হাটা শুরু করে। রাকিবের
বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় আনিতা। রাকিবের বাসায় পৌঁছিয়ে দেখে বাসা
জাঁকজমক ভাবে সাজানো। বাড়িতে মহাআয়োজন। আর বাড়ি ভর্তি লোকজন।
রাকিব সবার সঙ্গে আনন্দে মেতে আছে। ওইখানে যে আনিতা এসে দাঁড়িয়ে আছে তা
রাকিবের চোখে পড়েনি। রাকিব আছে তার শুভাকাঙ্খীদের নিয়ে ব্যস্ত। কেক কাটার

পর সবাই হাত তালি। শুধু হাত তালি দেই নেই আনিতা। রাকিবের সামনে হাজির
হয়ে আনিতা বলে, তোমার জন্মদিনে তোমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা এসে আমিও না এসে

পারলাম না। আনিতা অভিমানে বলে, তোমার এই আনন্দ স্বচোখে দেখে খুব ভালো
লাগছে। জানিনা আমার দেখায় তাতে কারো কোন অংশে কম পড়বে কিনা। রাকিব
কোন কথা বলে না। এদিকে রাকিবের এখানে যে মেয়েরা হইহুল্লায় মেতে আছে তার
বলে, রাকিব আনন্দ ঘন মূহুর্তে আনন্দ করো।
আনিতা বলে, রাকিব তুমি আনন্দঘন মুহূর্ত মিস করো না। এতে না জানি তোমার
সঙ্গ পেতে কম পরতে পারে।
রাকিব বলে, আনিতা এসেছো যখন তুমিও আনন্দ উপভোগ করো।
সবাই সব স্থানের জন্য না। আমি চলি, এটাই আমাদের শেষ দেখা। আনিতা চলে
আসে নিজের সাবায়। আনিতা ভাবে এখন আর আমার হারানোর ভয় নেয়। বাবা

মাকে হারালাম ভালোবাসার মানুষকে হারালাম। সবিতো আমার জীবন থেকে
হারিয়ে গেল।

প্রায় দুই বছর হয় রাকিবের সঙ্গে আনিতার কোন যোগাযোগ নেই। আনিতা অফিস
থেকে এসে কাপড় চেঞ্জ করে চায়ের পেলা নিয়ে বারান্দায় বসে। কলিং বেল বেজে

উঠলো। ফুফি দেখ তো কে এলো। ফুলি দরজা খুলে দেখে অপরিচিত লোক ফুলি
তাকে কখনোই দেখে নেই।

লোকটি জিজ্ঞেস করে আনিতা ম্যাডাম আছে?
হ্যাঁ আছে। ফুলি জোড়ে চিৎকার করে বলে, ম্যাডাম আমি তাকে চিনিনা। সে
আপনাকেই খুঁজে।

আনিতা চায়ের পেলা টেবিলে রেখে দরজার কাছে আসে। আনিতা তো অবাক। তুমি
এখানে?
ভিতরে আসতে বলবে না।

হু, ড্রয়েং রুমে বসতে দেয়।
ফুলি চা নাস্তা দেয়।

আনিতা এসবের কিছুই দরকার নেই। আনিতা আমি তোমাকে আমার জীবনে ফিরে
পেতে চাই। আমি তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধতে চাই। আনিতা অবাক চোখে চেয়ে
আছে, কিছু বলে না।
কি ব্যাপার তুমি কিছু বলো?

আমার কথা তো সেই কবেই তোমার সঙ্গে বলা শেষ। নতুন করে আমি আর কিছু
বলতে চাইনা। আর যে আমার মনের স্থানে নেই তাকে নিয়ে  ঘর বাঁধবো!
তার মানে তোমার মন থেকে আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছো?
আমি তোমাকে মন থেকে সরাই নেই, তুমি তোমার কারণে সরে গেছ।

যার হৃদয়ে ছিল শুধু আমার জন্য ভালোবাসা। আজ তার হৃদয়ে আমার কোনো স্থান
নেই!
যখন যার জন্য আমার বুকভরা ভালোবাসা ছিল সেদিন তো সে উপলব্ধি করে নেই।
আর সেই সম্পর্ক দরকার নেই। যে সম্পর্ক সুখ দেয় না দুঃখ দেয়। সে সম্পর্ক না
থাকাই ভলো।
আনিতা আমি বুঝে গেছি সত্যিকারের ভালোবাসা। আমার পাশে যারা ছিল ওরা
আমাকে ভালোবাসে নেই ওরা ভালোবেসেছে আমার টাকাকে। আমি বুঝতে পারছি
এত ভালোবাসা না। একসময় ওদের ওপর থেকে আমার ঘোর কাটে। এরপর থেকে
তোমার ভালোবাসার প্রশান্তির টানে আজ আমাকে তোমার কাছে টেনে নিয়ে
এসেছে। আর নিদানে সময় তুমি আমার পাশে দাঁড়িয়েছো।

সেসব কথা থাক। আর যার জন্য আমার হৃদয় ভালোবাসা ছিল আজ তার জন্য
আমার হৃদয় শূন্য। যাকে নিয়ে ঘর বাঁধার জন্য ব্যাকুল ছিলাম সে তো আমাকে চায়
নেই তখন। যে ভালোবাসা চিড় ধরেছে সেই ভালোবাসা আর জোড় নালাগা ভালা।
তোমাকে গ্রহণ করার আমার অন্তরে কোন জায়গা নেই। সেই স্থান যে বন্ধ।

আনিতা তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না।

যে ভালোবাসা একজনের জন্য সেই ভালোবাস অনেক জন্য প্রস্তুত রেখেছো। তোমন
আমি চাই না।

দেখ এখন আমি তোমাকেই চাই। আমি বুঝেগেছি তুমি আমার কত আপন।
তোমাকে ছাড়া আমার জীবনের পথ চলা নিরর্থক।

আমি তো তোমার কাছে কিছু চাই নেই। তবে আমি আজ তোমার কাছে চাইব।

রাকিব অতি আগ্রহ নিয়ে উল্লাসে সাথে বলে, কি চাও বলো, আমাকে?
তুমি আমার সঙ্গে কোন প্রকার যোগাযোগ করবেন না।

জানিনা এই পাওয়ার মধ্যে কি সুখ পাবে তুমি।

আমি কোন অভিযোগ তুলে ধরতে চাই না। যে মানুষ অন্যের ভালোবাসায় মহুয়া
নিজের সত্তাকে ভুলে যায়, তার কাছে ভালোবাসার কিবা মূল্য আছে। রাকিব না
পাওয়ার বেদনা নিয়ে চলে যায়। আনিতার প্রতীতি সুখ নিজের মাঝে। অন্যের উপর
ভরসা না করে, সুখ সেতো দূরে নয় নিজের মাঝেই আছে অফুরন্ত সুখ।

www.bbcsangbad24.com