জুন,২৯,২০২১

“সুলেখা আক্তার শান্তা” 

ছোট্ট একটা সংসার সাজানো গোছানো মায়া মমতায় ভরা। বাহার আর বানিয়ার একমাত্র ছেলে নয়ন, ছেলেকে নিয়ে হাসিখুশিতে কেটে যায় তাদের দিন।বাহার স্ত্রীকে বলল মাঝে মাঝে জাহিদ ভাইয়ের সাথে দেখা হয়, সে আমাকে বিদেশের কথা বলে, দেশে থেকে কি করবা তার চেয়ে বিদেশে গিয়ে ভালো জীবন যাপন করো। দেখো না আমি কতজনকে বিদেশ পাঠাইলাম তারা কত ভালই না আছে।
তুমি এসব কি বলছ। আমাদের জমি জমা যা আছে তাতে আমাদের সংসার ভালোভাবে চলে। আমাকে আর ছেলেকে রেখে তুমি থাকতে পারবে?
তোমাদের জন্য আমার খারাপ লাগবে, সংসারের ভালোর জন্যই তো যাইতে চাই। আমি তো একেবারে যাচ্ছি না। ছেলের একটা ভবিষ্যৎ আছে না। তোমাদের জন্যই তো আমার চিন্তা।
তুমি কাছে থাকো এছাড়া আমি আর কিছু চাই না। ভালবাসার দাবি স্ত্রীর কন্ঠে।
বাহার বিদেশের ব্যাপার মন থেকে কিছুতেই সরাতে পারছিল না, তাই বউয়ের কাছে বলতে শুরু করল। জাহিদ ভাইয়ের প্রস্তাবে আর না করতে পারলাম না, তাই বিদেশে যাবার ব্যাপারে কথা দিয়ে এসেছি। আমার বসত বাড়ি রেখে আর ফসলের জমি জমা যা আছে সব বিক্রি করে যে টাকা আসবে, সেই টাকা দিয়ে আমি বিদেশ যাবো। বানিয়া কোন কথাই বলছে না, মুখ মলিন করে রেখেছে।
মুখ ভার করে রেখেছো কেন। কিছু তো বলো।
আমি আর কি বলবো। যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার তা তো তুমি নিয়েছো।
বাহার জমিজমা বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার জন্য টাকা রেডি করল। এদিকে ভিসা এসে গেছে। বানিয়ার ভীষণ মন খারাপ বাহার তা বুঝতে পেরে, আমি তো ফোনে যোগাযোগ করব, মাসে মাসে টাকা পাঠাবো। বানিয়া কোন কথা না বলে ঘরের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে রইল।আর এই যে আমার নয়ন বাবা বাবাজি কলিজার টুকরা আমি তোমার জন্য কত খেলনা পাঠাবো।
নয়ন আনন্দে, বাবা তুমি আমার জন্য খেলনা পাঠাবে।
হ্যাঁ বাবা। বাবা আমি তোমার বুকে ঘুমাবো। ওরে আমার বাবা আসো তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেই। বাবার বুকে ছাড়া নয়ন ঘুমাতে পারে না, বুকে শুইলে নয়ন ঘুমিয়ে যায়।
বাহার বিদেশ যাওয়ার মুহূর্তে বানিয়াকে বলল তোমাদের রেখে যাচ্ছি, খারাপ লাগছে তোমাদের জন্য।
তুমি এ কথা বলো না, আমাদের নিয়ে ভেবো না। আমি যে টাকা পাঠাবো তা দিয়ে তোমার শাড়ি চুড়ি যখন যা লাগবে কিনে নিবে। বানিয়া মাথা নাড়ে। আমরা মা ছেলে ভালো থাকবো তুমিও ভালো থেকো।
আসি বউ। ছেলের আর বানিয়ার মাথার উপর হাত বুলিয়ে গেল। বানিয়া যতদূর দেখা যায় তাকিয়ে রইল স্বামীর যাত্রা পথের দিকে। দুচোখের পানি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছতে থাকে। বাহারও পিছনের দিকে তাকাতে থাকে বার বার করে। তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা, স্বামী পৌঁছে ফোন দিবে। কিন্তু ফোন আসে না স্বামীর।
বাহার কোন যোগাযোগ করছে না। উদ্বিগ্ন বানিয়া। হঠাৎ ফোন একটা এলো, তোমরা কেমন আছো? আমার ছেলে ভালো আছে। আমরা ভালো আছি, তুমি কেমন আছো?
আমি ভালো নেই। ফোনের অপর প্রান্তে থেকে কেঁদে ফেলে বাহার। আমার সব শেষ হয়ে গেছে জায়গা জমি যা বিক্রি করে আমি এসেছিলাম।
এসব তুমি কি বলছো।
আমি যদি তোমার সাথে যোগাযোগ করতে না পারি। তুমি আমার ছেলেকে নিয়ে থেকো। কোথাও যেও না। স্বামী হিসেবে তোমার প্রতি আমার দাবি।
তারপর ফোনের লাইন কেটে গেল আর কোন কথাই শুনতে পেলো না। বারবার ফোন দিল বানিয়া এই নাম্বারে। তারপর সেই নাম্বারে কল ঢুকলো না। বানিয়া চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো, পাড়া প্রতিবেশী সবাই এসে জড়ো হল, সবাই জিজ্ঞেস করল কি হয়েছ বানিয়া। আমি কিচ্ছু জানি না। বাহার আমাকে ফোন দিয়ে কি কি যেন বলল, ওর কি জানি সমস্যা হয়েছে। কেউ কেউ বলতে শুরু করল আহারে পোলাডার কি হইলো। বিদেশ যাইতে না যাইতেই বিপদ। ধৈর্য হারা হইস না। আল্লাহকে ডাক। নয়ন বলল, মা মা তুমি কাঁদছো কেন। সবার চোখে পানি এসে যায় বানিয়ার কান্না দেখে। দেখ কিভাবে খোঁজ নিতে পারোস বাহারের। এভাবে কাঁদিস না। বানিয়াকে সবাই সান্ত্বনা দেয়।
একে একে দুই মাস পার হলো। কোন খোঁজ খবর পাওয়া গেল না বাহারের। জাহিদের কাছে অগত্যা গিয়ে হাজির হলো বানিয়া। তাকে বলল ভাই আপনি যদি একটা খোঁজ নিতে।
আমি কি করুম আমার দরকার ছিল বিদেশে পাঠানের আমি পাঠাইয়া দিচ্ছি।
ভাই আপনার তো কোনো দোষ দিচ্ছিনা। যদি ফোনে একটা খোঁজ নিতেন।
এই পর্যন্ত বহুবার চেষ্টা করছি খোঁজ নিতে, কিন্তু বিদেশের খবর সংগ্রহ করা সহজ ব্যাপার না।
বানিয়া মরিয়া হয়ে বলে ভাই দেখেন ছেলেটা আমার মাসুম বাচ্চা ওর দু মুঠো খাবার দিতে হয়।
আমার তো টাকা পয়সা ওরকম নাই যে তোমাকে দেবো।
নিরুপায় বানিয়া হতাশ হয়ে বলে ঠিক আছে ভাই যাই।
যাও।
বানিয়া বাড়ি আসার পর নয়ন বলল, মা বাবা আসবে না। ছেলেকে মনমরা হয়ে বলে আসবে তোমার বাবা। ক্ষুধা লাগছে মা। ঘরে এক মুঠো চাল নেই দিশেহারা হয়ে পড়ে বানিয়া কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না। গাছে থেকে লাউ পেড়ে রান্না করে খেতে দেয় ছেলেকে। নয়ন বলল, মা ভাত রান্না করলে না। ছেলের গালে হাত বুলিয়ে বাবা কাল ভাত রান্না করবো আজ তুমি এটা খাও। বানিয়ার এখন অপেক্ষা দিন আসলে রাতের অপেক্ষা রাত আসলে দিনের অপেক্ষা স্বামীর তো কোন খোঁজ আসে না।
সকালে ঘুম থেকে নয়ন উঠে বলল, মা আমি ভাত খাব। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে বানিয়ার। কিছু না ভেবে চলে যায় মাজেদার বাড়ী। আপা আমার ছেলেকে একটু ভাত দিবেন।
মাজেদারা অবস্থাপন্ন। বলল, ভাত নিতে চাস? আমার থালা বাসন গুলো ধুয়েদে।
দেনা আপা ধুয়ে দিচ্ছি। থালা বাসন ধোয়া শেষ হলে এই নে ভাত একটু বেশি করে দিলাম তুমিও খেতে পারবি। বানিয়ার অনেক দুঃখের মাঝেও হাসতে হাসতে বাড়িতে আসলো ছেলেকে ভাত খাওয়াতে পারবে, তারপর মা ছেলে একসাথে ভাত খেলো।
নয়নের ঘুরেফিরে একই কথা মা-বাবা আছে না কেন?
বানিয়া মনে মনে বলে বাবারে মায়ের কাছে বারবার বলিস মা বাবা আসে না কেন মা বাবা আসে না কেন। আমি যে তার কোন খোঁজ এই জানিনা, কি করে তোকে বলি।
নয়ন মুখ মলিন করে বসে আছে পা বিছিয়ে। বানিয়ার তা দেখে মনে হল ছেলেটি আমার ক্ষুধার জ্বালায় এমন অসহায় হয়ে বসে আছে। আমার মাসুম বাচ্চা এত কষ্ট করছে আমি মা বেঁচে থাকতে। নিরুপায় বানিয়া ভাবে, আমি বাড়ি বাড়ি কাজ করব আমার ছেলের জন্য। মাজেদার কাছে আবার যায়। করুন স্বরে ডাকে আপা।
মাজেদা উঁচু স্বরেই বলে, ডাকছিস কেন?
যদি আমার ছেলেকে কয়টা ভাত দিতেন।
কেউ কি এমনি এমনি ভাত দেয়? কাজ করতে পারিস না।
আমি কাজ করে ভাত নেব। আপনি যে কাজ আছে আমাকে দেন। আমি আপনার সব কাজ করুম। বিনিময় আমার একটু ভাত দিবেন।
কাজ শেষ করে যাওয়ার সময় ভাত নিয়ে যাবি।
বানিয়া আশ্বস্ত হয়। কাজ শুরু করে। আমি সব কাজ শেষ করে আপনাকে বলব। কাজ শেষে ভাত দিয়ে মাজেদা বলে, প্রতিদিন আসবি কাজ শেষে তোকে ভাত দিয়ে দেব। আমারও কাজ হলো তোর উপকার হলো। বানিয়া মাথা নাড়লো।
বাড়ি এসে ছেলেকে কাছে ডাকলো বানিয়া, বাবা তোমার জন্য ভাত নিয়ে এসেছি। তুমি এখন ভাত খাবে বাবা। মাকে নয়ন জড়িয়ে ধরে, মা তোমাকে ছাড়া ভালো লাগেনা। বাবা আমার ছেলে বলে কি। শোন বাবা কাল থেকে তুমি বাড়ি থাকবা কোথাও যাবা না। ঘরে বসে খেলবা।
আমি কাজে যাব।
ছেলে বলে, ঠিক আছে মা। বানিয়া ছেলেকে আদর করে, ওরে আমার যাদুসোনা কত ভালো।
হঠাৎ নয়ন অসুস্থ হয়ে পড়ে, বানিয়া কাজে যেতে পারে না। মাকে ছাড়তে চায় না নয়ন। মায়ের আঁচল টেনে ধরে, মা তুমি কোথাও যেও না। আমার কাছে থাকো। বাবা আমি কোথাও যাব না, মায়ের সান্তনা।
ছেলেকে ডাক্তার দেখাবে হাতে কোনো টাকা নেই, ঘরের চাল নেই ছেলেকে ভাত রান্না করে খাওয়াবে। বাবা তুমি থাকো আমি তোমার জন্য ভাত নিয়ে আসবো। মা আমি ভাত খাব না তুমি থাকো। ছেলের কোন কথা না শুনে পুনরায় কাজে গিয়ে হাজির হয় মাজেদার কাছে, মাজেদা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে আসছে নবাবজাদী।
বানিয়া নরম সুরে বলে, আপা আমারে কয়টা টাকা দিবেন? ছেলেকে ডাক্তার দেখাবো। ছেলে আমার অনেক অসুস্থ। এজন্য আমি কাজে আসতে পারিনি।
মাজেদা বলে ওঠে, তুই কি আমার কাছে টাকা পাস যে তোকে আমি টাকা দিব।
বানিয়া আকুতি করে, কত জায়গায় কাজ করলে তো মাসে বেতন দেয়। আপনি আমাকে কোন বেতন দেন না।
যে কাজ করো তাতে আবার বেতন, যা অন্য জায়গায় কাজ কর। আমার এখান থেকে দূর হ। বানিয়া মাজেদার মেজাজ খারাপ দেখে, কোন কথা না বলে কাজ করা শুরু করল। কাজের শেষে বলল, আপা কিছু দিবেন।
মাজেদা বলল চাউল নিবি?
বানিয়া চাউল নিলে কতক্ষণে আবার রান্না করমু ছেলে আমার না খেয়ে আছে, ভাত দেন। খাবার নিয়ে বাড়ি এলো, এসে দেখে ছেলের কোন সাড়াশব্দ নেই, জ্বরে ছেলের গা পুড়ে যাচ্ছে। নয়নের মুখে ভাত দিতে চেষ্টা করল কিন্তু ভাত মুখে দিতে পারল না। ছেলের অবস্থা দেখে বানিয়া চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। এখন আমি কি করি। আল্লাহ তুমি বলে দাও। কান্না শুনে পাশের বাড়ির ছালেহা এলো, কান্নাকাটি না করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে চল ছেলেকে। বানিয়া বলে, ডাক্তারের কাছে যামু কি নিয়া। আমার হাতে কোনো টাকা নেই।
ছালেহা বলে, তুই কাঁদিস না তোর কান্না সইতে পারছি না। আমার কাছে টাকা আছে তা নিয়ে ডাক্তারের কাছে চল। এই টাকা তোর ফেরত দিতে হবে না। অসহায় বানিয়া আশার আলো দেখে পায়। নয়নকে নিয়ে দুইজনে মিলে ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার দেখানোর পর আস্তে আস্তে নয়ন সুস্থ হয়। ছেলেকে সুস্থ দেখে বানিয়ার মুখে হাসি ফোটে।
ছালেহা বলে বানিয়াকে শোন তুই তো এখানে কাজ করে কোন টাকা পাস না। অন্য জায়গায় কাজ করলে টাকা পাবি।
কোথায় আপা?
ছেলেকে নিয়ে শহরে চলে যা।
আমি আমার স্বামীর ভিটা রেখে কোথাও যাব না।
এত স্বামীর ভিটা স্বামীর ভিটা করিস কেন। কেউ নিয়ে যাচ্ছে তোর স্বামীর ভিটা।
এ যে আমার পরম শান্তি আমি আমার স্বামীর ভিটায় আছি।
থাকতে তুই এখানে পড়ে আর কষ্ট কর। এই বলে ছালেহা চলে যায়।
মা তুমি কোথাও যাবে না। বানিয়া ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো, না গেলে বাবা আমরা মা-ছেলে খাব কি। মা আমি বড় হয়ে তোমাকে কোন কাজ করতে দেবো না। ছেলেকে আদর করে ওরে আমার বাবা ধরে দুই গালে দুটো চুমু। বাবা ঘরে বসে খেলো। ছেলেকে বুঝিয়ে বানিয়া কাজে বের হয়।
বানিয়া কাজে আসলে মাজেদা অনেক কথাই শোনায়, আমি কাজ দিয়ে তোকে বাঁচিয়ে রাখছি না হলে মা ছেলে খাতি কি। বানিয়া কথার কোন উত্তর না দিয়ে ভেবে নেয় কপালে যা আছে তাইতো হচ্ছে। নিজের মতো করে কাজ করতে থাকে। আমি যদি তোকে কাছ থেকে বাদ দেই তোর খাওয়া পরার কোনো উপায় আছে। এরকম করলে তোকে আমি বাদ দিয়ে দেবো। নিরুপায় বানিয়া বলে, আপা আমি ঠিকমতো আসুম।
বানিয়া বাড়ি ফিরলে নয়ন দৌড়ে আসে মায়ের কাছে। অনেক উৎসাহ নিয়ে বলে, মা জানো আজ না ববির চাচা বড় একটা ইলিশ মাছ আনছে। আমরাও আনবে বলো মা। বানিয়ার হাসিমুখ মলিন হয়ে যায়, কি করে সে ছেলের আবদার পূরণ করবে। নয়ন বলতে থাকে মা আনবা না বল মা আনবা না। বানিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে. আনবো বাবা চলো ঘরে যাই।
পরের দিন কাজে যাওয়ার সময় নয়ন মনে করিয়ে দেয়, মা তুমি কিন্তু ইলিশ মাছ আনব। বানিয়া মাথা নাড়ে, নয়ন হেসে মায়ের মুখের দিকে তাকায়। কাজে এসে মাজেদার কাছে আমতা আমতা করতে থাকে বানিয়া, আপা একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আমার ছেলে ইলিশ মাছ খাইতে চাইল, আমারে কয়টা টাকা দিবেন। রেগে ওঠে মাজেদা, কি কস তুই। যখন যে কাজ করস সাথে সাথেই তার মজুরী দিয়ে দেই। আবার কিসের টাকা চাস। তোদের লোভের শেষ নাই।
বানিয়া কষ্ট নিয়ে বাড়ি আসে ফিরে। নয়ন মাকে দেখে ইলিশ মাছের কথা জিজ্ঞেস করে, মা ইলিশ মাছ আনোনি। ছেলের মুখে কথা শুনে বানিয়া কষ্ট আরো বেড়ে যায়। তোর ইলিশ মাছ খাইতে ইচ্ছা করে কেন। নয়ন কে আঘাত করতে থাকে বানিয়া। নয়ন কাঁদতে কাঁদতে বলে, মা আর ইলিশ মাছের কথা বলব না। তুমি আমাকে মেরো না। ছেলেকে মেরে নিজেও নিজের কপাল বসার ফিরা দিয়ে আঘাত করে। বানিয়ার কপাল থেকে রক্ত ঝরে পড়ে। ছেলেকে কোলে নিয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। নয়ন তার মার কপালের রক্ত দেখে বলে, মা তুমি কেঁদো না। আমি আর ইলিশ মাছের কথা বলবো না। নয়ন ছোট হাত দুটি দিয়ে মায়ের কপালে রক্ত মুছে দেয়। বাবারে আমি তোর অভাগিনী মা তোর জন্য কিছুই করতে পারিনা, দুঃখে বুক ভেঙ্গে যায় বানিয়ার। রাতে নয়নের জ্বর এসে।
বানিয়া আজ কাজে এসে মাজেদার স্বামীর কাছে বলল মাজেদ ভাই আমার ছেলে ইলিশ মাছ খেতে চাইছে আমারে কিছু টাকা দিবেন।
তোর ছেলে ইলিশ মাছ খাইতে চাইছে, ঠিক আছে আমি টাকা দিচ্ছি তুই কিনে নিস। মাজেদ টাকা বের করে বানিয়াকে দিতে যায় এমন সময় মাজেদা এসে হাজির। বানিয়ার হাত থেকে টাকা কেড়ে নেয় মাজেদা। নিলজ্জ মেয়ে মানুষ। তুই আমার স্বামীর কাছ থেকে টাকা নিচ্ছিস চরিত্রহীন মেয়ে। বানিয়কে কোন কিছু বলতে দ্বিধা করে না মাজেদার।
আপা আপনি এসব কি বলছেন। আমার চরিত্রের উপর অপবাদ দিচ্ছেন।
ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে যায় মাজেদ। আমার কাছে টাকা চাইলো ওর ছেলের কথা বলে, তাই আমি দিলাম। তা নিয়ে তুমি এ ধরনের কথা বলছ।
মাজেদা বলে তোমার এই নিয়ে কথা বলতে হবে না।
বানিয়া কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি আসে। এসে দেখে ছেলের জ্বর অনেক বেড়েছে, অসহায় বানিয়া স্বামীর কথা মনে করে কাঁদে। তুমি কি বিদেশে গেলে আমার সব শেষ হয়ে গেল, আজ আমার নয়নকে খেতে পড়তে দিতে পারছি না। নয়ন কে ডাকে বাবা নয়ন কথা বল আমার সাথে। নয়নের কোন সাড়া নেই। কেঁদে কেঁদে বানিয়া ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে।
নয়ন ঘুমের ঘোরে বলে বাবা তুমি এসেছ। আমার জন্য ইলিশ মাছ নিয়ে, কত বড় ইলিশ মাছ, মা রান্না করে দিবে আমি ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাব। বানিয়া ছেলের মুখের কথা শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায় বানিয়ার, বাবা তুই কি বলছিস। কই তোর বাবা ইলিশ মাছ নিয়ে আসছে। বানিয়া ছেলের কথা শুনে কেঁদে দেয়, স্বপ্ন দেখছিস বাবা নয়নের কোন কথা নেই।
সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজে যাবে বানিয়া। বানিয়া কাপড়ে টান লাগে দেখে নয়ন কাপড়ের আঁচল হাতের মুঠোয় ধরে ঘুমিয়ে আছে, বানিয়া ছেলের হাতের মুঠো থেকে কাপড় ছাড়িয়ে নেয়, ছেলেকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে কাজে যায়। কাজে না যে উপায় কি। তাই কাজে চলে যায়।
বানিয়া আজ কাজ থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরে। ছেলের জন্য মনট খুব ছটফট করে তার। তাই সে বাড়ি চলে আসে। নয়নকে ডাকে বাবার নয়ন ওঠ। কোন সাড়া না পেয়ে। চমকে ওঠে বানিয়া। দেখে নয়নের গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে আছে, কোন শ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়ছে না। বানিয়া বুঝে ফেলে যে তার ছেলে আর নেই। বানিয়া বুক পীড়ন দিয়ে কাঁদতে থাকে। বানিয়ার বুক ফাটা আর্তনাদ শুনে আশেপাশের সবাই ছুটে আসে।
ছালেহা বলে, কত করে বললাম ছেলেকে নিয়ে শহরে যা। স্বামীর ভিটা ছেড়ে গেলি না, এখন থাক স্বামীর ভিটা আগলে রাখ। কে শুনে কার কথা। বানিয়ে কেঁদে কেঁদে বলে আমি আমার ছেলেকে ইলিশ মাছ খাওয়াতে পারিনি। নয়ন আমার কখনো কিছু আবদার করেনি। বানিয়া ছেলেকে বুকে নিয়ে পাগলের মত করে। বাবা আমি তোর জন্য ইলিশ মাছ আনতে যাচ্ছি। বানিয়ে আর আহাজারি দেখে সবাই কাঁদে। সবাই তাকে সান্ত্বনা দেয়। সান্ত্বনায় কি মায়ের শূন্য বুক পূর্ণ হয়। ছেলেকে রেখে বানিয়া হঠাৎ নদীর দিকে দৌড়াতে থাকে ।
সবাই তাকে ধরা চেষ্টা করে। বানিয়া বলে, আমাকে তোমরা ধরো না, আমি আমার ছেলের জন্য ইলিশ মাছ আনতে যাচ্ছি। বানিয়া তারপর নদীতে ঝাঁপ দিল, নদীতে ঝাঁপ দিলে আর ওঠেনা। যখন উঠল মৃত লাশ হয়ে উঠল। বানিয়া লাশ তুলে এনে প্রতিবেশীরা মা আর ছেলেকে পাশাপাশি কবর দিল। মা আর ছেলে কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারেনা। মৃত্যু ও তাদের আলাদা করতে পারল না। একসঙ্গে চলে যায় তারা পৃথিবীর মায়ার বাঁধন ছেড়ে।

www.bbcsangbad24.com