আগস্ট,০৬,২০২১

“সুলেখা আক্তার শান্তা”

ঝন্টু আর পিন্টু দুই ভাই। ঝন্টুর বারো বছর বয়সের ছোট পিন্টু। ছোট ভাইয়ের সব ব্যাপারে লক্ষ রাখে বড় ভাই
ঝন্টু। মা রাহেলা ছোট ছেলে পিন্টুর জন্য কিছু করতে গেলে বড় ছেলে ঝন্টু বলে, মা আমার ভাইয়ের যা কিছু
করার দরকার সব আমি করব, তোমার ওর কিছুই করতে হবে না।
ভাই পিন্টুকে কখনো বুকে কখনো মাথায় কি করবে দিশেহারা হয়ে যায়। তা দেখে প্রতিবেশী বলে, ঝন্টু তোর
ভাইকে নিয়ে তোর আহ্লাদির আর শেষ নেই।
আমার ভাইকে নিয়ে তোমরা এভাবে কথা বলো না। আমার ভাই আমার সব। কেউ যদি বলে, পিন্টু দেখতে
অনেক সুন্দর। তা শুনে ঝন্টু ঘাবড়ে যায়। আমার ভাইকে নিয়ে তোমাদের হিংসা হয়? ওর প্রতি তোমাদের কুদৃষ্টি
পড়েছে। ভাইয়ের অমঙ্গল হবে এই আশঙ্কায়। নিজেই কাজল বানিয়ে ভাইয়ের কপালে টিপ পরিয়ে দেয় যাতে
কারো নজর না লাগে।
রাহেলা ছেলে ঝন্টুকে বলে, বাবা তোর ভাইকে নিয়ে কেউ কিছু বললে, তুই এতো ক্ষিপ্ত হয়ে যাস কেন? সবাই
তোর সাথে দুষ্টামি করে।
না মা আমার ভাইকে নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারবে না।
অল্প বয়সে ঝন্টু সংসারের হাল ধরায় পড়ালেখা করতে পারেনা। বাবা লেকয়াত চোখ অন্ধ হওয়ার কারণে
সংসারের কাজকর্ম কিছুই করতে পারেনা।
ঝন্টু দায়িত্ব বহন করতে গিয়ে পড়ালেখার ইচ্ছে থাকা সত্বেও তা করা হয়ে ওঠে না। ছোট ভাইকে নিয়ে তাই ঝন্টুর
অনেক আশা ভরসা। ছোট ভাইকে সে পড়ালেখা করাবে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তুলবে।
দিন যায় পিন্টুর স্কুলে যাবার বয়স হয়। ঝন্টু ভাইকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়। কিন্তু পিন্টু খুব দুষ্টু প্রকৃতির,
পড়ালেখায় তার মন নেই।
পিন্টু বন্ধুদের নিয়ে গাছে ওঠা, পাখি ধরা, ঘোরাফেরা করা এই গুলিতেই তার যত আগ্রহ।
বড় ভাই ঝান্টু পড়ালেখার কথা বললে।
পিন্টু এখন বেশ কথা বলতে শিখেছে। বলে, আমাকে দিয়ে পড়ালেখা হবে না যা করছি করতে দাও।
পিন্টু ঠিকমত পড়ালেখা না করায়, প্রতি ক্লাসেই সে ফেল করে। প্রতি ক্লাসেই তার দুইবার তিনবার করে থাকতে
হয়। পড়ালেখা না করলেও তার দাবি, শখের কমতি নাই। ভাইয়া আমাকে শার্ট-প্যান্ট দিতে হবে, এটা ওইটা নানা
পদের বায়না তার। কষ্ট হলেও ঝন্টু ভাইয়ের দাবি পূরণে কার্পণ্য করেনা। ঝন্টু ভাইকে বলে, আমার গায়ের রক্ত
বিক্রি কইরা হলেও তোর বায়না আমি পূরণ করব তবু তুই পড়ালেখা কর।
পিন্টু ফেল করতে করতে একসময় সে নাইনের পড়ে। পিন্টু বলে, ভাইয়া আমার দ্বারা পড়ালেখা আর হবে না।
ঝন্টু বলে, এমন কথা বলিস না ভাই!
ঠিক আছে, তোমার যদি আমাকে পড়ালেখা করাতে এতই ইচ্ছা করে? তাহলে আমি আর গ্রামে থেকে পড়ালেখা
করতে চাই না। আমি ঢাকায় পড়ালেখা করবো।
ঝন্টু অবাক হয়ে বলে, ভাই বলিস কি তুই! ঢাকায় থাকবি আমাদের তো ওইখানে কেউ নেই। আর তোকে ছাড়া
আমি থাকবো কি করে?
ঝন্টু ভাইয়ের ইচ্ছা পূরণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। অনেক খোঁজ করে ভাইকে ঢাকায় থাকার জন্য একটা মেসের
ব্যবস্থা করে। পিন্টুর অনুপস্থিতিতে মনটা ভীষণ খারাপ হলেও ভাইয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সব মেনে নেয়।
এদিকে পিন্টুর স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয় না। পড়ালেখা বাদ দিয়ে তার কাজ হল খাওয়া-দাওয়া আর হই
হুল্লোড় করে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো।

ভাইয়ের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিয়ে মাসে এিশ দিন জন্মদিন পালন করাই ছিল তার নেশা। আজ এই
বন্ধু বান্ধবীকে নিয়ে নিজের জন্মদিন পালন করে কাল ওবন্ধু-বান্ধবকে নিয়ে জন্মদিন পালন করে। প্রতিদিন
এভাবে জন্মদিন পালন করে পিন্টুর গিফট নেওয়াই ছিল শখ। একসময় বন্ধুমহলে জানাজানি হয়ে যায় সে মিথ্যা
জন্মদিনের আমন্ত্রণ করে বন্ধুদের কাছ থেকে ভাল ভাল গিফট পাওয়া ছিল তার অদ্ভুত একটা আনন্দ। এরপর
পিন্টু জন্মদিনে বন্ধু-বান্ধবীদের আমন্ত্রণ করলে কেউ আর আসেনা, তাতে তার মন ভীষণ ক্ষুন্ন হয়।
রাহেলা ছেলে ঝন্টুকে বলে, বাবা তুই তোর ছোট ভাইকে ঢাকায় রেখেছিস পড়ালেখা জন্য, কাছে থাকতেই সে
ঠিকমত পড়ালেখা করে নেই। এখন দূরে থেকে কি ঠিকমত পড়ালেখা করবে এ নিয়ে আমারতো বড় চিন্তা হয়।
মা তুমি থামো তো। তুমি দেখো পিন্টু ঠিকই ভালোভাবে পড়ালেখা করে আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।
বাবা আমিও তাই আশা করি তুই যে ভাইয়ের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করিস ও যেন তার প্রতিদান দিতে পারে।
ঝন্টু ভাইয়ের সাথে ফোনে যোগাযোগ করে।
পিন্টু বলে, ভাই আমি পড়ালেখা নিয়ে অনেক ব্যস্ত তাই কথা বলে, সময় নষ্ট করতে চাই না। আমি মনোযোগ দিয়ে
পড়ালেখা করতে চাই। এ কথা শুনে ঝন্টু ভাইয়ের প্রতি অনেক খুশি। যাক আমার ভাইয়ের সুহমত হয়েছে ওর
মত করে ও থাক তাহলে পড়ালেখায় বেশি মনোযোগী হতে পারবে।
এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ হবে ঝন্টুর ভাইকে নিয়ে অনেক আশা সবাইকে বলে। আমার সোনার টুকরা
ভাই সে পরীক্ষায় পাস করবে। তোমাদের সবাইকে পেট চুক্তি মিষ্টি খাওয়াবো। অনেক আনন্দ করবো। তোমার
যা খেতে চাবে তাই খাওয়াবো। কেউ বলে, তোমার ভাই এতকালেও যখন পাস করে নেই। সে আর পাস করবে
বলে মনে হয় না। তা শুনে ঝন্টু রেগেমেগে শোনো, আশা গুনে বরকত। তোমরা যেমনি আশা করবে তেমনি তার
ফল পাবে। ভালো আশা করতে দোষ কিসের?
বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে। মনের মধ্যে খুব উচ্ছ্বাস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝন্টু। আর সবার কাছে বলে
বেড়ায় তার ভাইয়ের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে। কিন্তু সব আশা নিঃশেষ হয়। পিল্টু সঙ্গে যোগাযোগ করে
জানতে পারে সে পরীক্ষায় ফেল করেছে।
ঝন্টু ভাইকে নিয়ে সব আশা ভরসা নিরাশ হওয়া হতাশ হয়ে বসে থাকে।
রমিজ বলে, ঝন্টু আমার গাছের ডালপালা গুলো কেটে দে। ঝন্টু ভালো-মন্দ কিছুই বলে না। কিরে ঝন্টু কথা
বলিস না কেন? ভাইয়ের কথা বাদ দিয়ে এখন নিজেকে নিয়ে ভাব। বিয়েশাদী করে সংসারী হ। ওকে এনে কাজে
কর্মে লাগিয়ে দে, অনেক তো হলো এখন কাজ করে ভাত খাক।
ঝন্টু চেতেমেতে উঠে বলে, আমাকে কাজে ডাকতে এসে আমার ভাইকে নিয়ে এত কথা বলছ কেন? তোমার কাজ
আমি করবো না।
রমিজ ঠিক আছে, তোর ভাইকে নিয়ে আর কিছু বলব না। এরপর ঝন্টুর হাত ধরে এবার চল আমার সাথে
কাজে। ঝন্টু গাছে উঠে কিছু ডালপালা ছেড়ে দেওয়ার পর, অন্যমনস্ক হাওয়ায় গাছ থেকে নিচে পড়ে যায়। পরে
যাওয়াতে ডাল ঝন্টুর পেটের ভিতরে ঢুকে পরে।
পিন্টু ভাইয়ের দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে চলে আসে। এসে দেখে মা তার ভাইয়ের পাশে বসে কাঁদছে। মা আমার
ভাইয়ের এ কি অবস্থা হল!
রাহেলা ছেলে পিন্টুকে বলে, তুই এখানে কেন এসেছিস?
মায়ের অভিমান বুঝতে পারে পিন্টু। মা ভাইয়ের কাছে ভাই তো আসবেই। ভাই যে আমাকে কোলে পিঠে করে
মানুষ করেছে। ভাইকে জড়িয়ে কাঁদে, সবাই আমার প্রতি অধৈর্য হলও একমাত্র ভাই আমার প্রতি কখনো অধৈর্য
হওনি। দিনের পর দিন তুমি আমার স্বাদ-আহ্লাদ পূর্ণ করতে কত পরিশ্রম করেছ। কিন্তু আমি তোমার আশা পূর্ণ
করতে ব্যর্থ হয়েছি। ভাইয়া আজ আমি তোমাকে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করবো না কিন্তু তোমার আশা পূর্ণ করাই হবে
আমার একমাত্র লক্ষ্য। ভাইয়া আজ আমি জীবনকে বুঝতে শিখেছি। তবে তোমাকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়ে।

রাহেলা উত্তেজিত হয়ে পিন্টু বলে, তুই আমার দু'চোখ সামনে থেকে সরে যা। তোর জন্য আজ আমার বড় ছেলের
এই দশা। সারাদিন আমার ছেলেটা খেটে খেটে মরে আর সে আছে তাংফাং নিয়ে।
মা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আজ ভাইয়া এই অবস্থা আমার জন্য আমি কোনদিনও নিজেকে ক্ষমা করতে
পারবোনা।
তোর ক্ষমা নিয়ে তুই থাক। তুই আমার বাড়িতে কখনোই ঢুকবি না এই আমার শেষ কথা।
মা আমাকে তোমরা পর করে দাও বেশ ভালো কিন্তু আমি যে তোমাদের ছাড়া থাকতে পারবো না। মা পৃথিবী
আমার অন্ধকার হয়ে আসছে।
তুই আমাকে মা বলে ডাকবি না।
মা আমাকে আর একটা বার ভাইয়ার মনের মত করে চলার সুযোগ দাও।
সময়ের কাজ সময়ে করো নেই আর এখন এসেছ তুমি সুযোগ গ্রহণ করতে। আমার সামনে থেকে সরে যা তুই।
ঠিক আছে, মা আমি চলে যাচ্ছি। জানিনা তোমাদের সামনে কবে আমি উপযুক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারবো। মা আমি
যেখানেই থাকি না কেন তোমরা আমার হৃদয় থেকে কখনোই দূরে থাকবে না। তোমাদের নিয়েই আমার পৃথিবী।
মা তোমাদের ছেড়ে আমি যেতে পারছিনা।
বাহানা না করে, তুই এখান থেকে দূর হ।
ঝন্টু বলে, মা তুমি পিন্টুকে ফিরাও ওকে যেতে দিও না।
তুই থাম। ওকে যেতে দে। ও যেখানেই যায় যাক চলে।
পিন্টু ফিরে আসে ঢাকায়। পরিবর্তনের সূচনা হয় তার মধ্যে সে শুরু করে দেয় পুরোদমে পড়ালেখা। তার মনের
মধ্যে একটাই জেদ পড়ালেখা করে ভাইয়ের ইচ্ছা পূর্ণ করবে। যে ভাই আমার পড়ালেখার জন্য দিনের পর দিন
আমার অন্যায় দাবি পূর্ণ করেছে। আজ আমি আমার নিজের জন্য নয় আমার ভাইয়ের আশা পূর্ণ করব।
পিন্টু যোগাযোগ করে রমিজ সঙ্গে বলে, ভাই আমি মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠাবো এই টাকাটা আপনি আমার
মায়ের হাতে দিবেন। কিন্তু আমার কথা বলবেন না, বলবেন এই দুর্দিনে আপনি তাদের সহযোগিতার হাত
বাড়িয়েছেন।
সময় গড়িয়ে চলে। পিন্টু বহু বছর পর বাবা-মা ভাইয়ের কাছে ফিরে আসে। পিন্টু বড় ভাই ঝন্টুকে বলে, ভাইয়া
আজকে তোমাকে একটি জায়গায় নিয়ে যাব।
ঝন্টু বলে, নারে ভাই আমি কোথাও যাবো না।
ভাইয়া তোমাকে যে যেতেই হবে, না হয় আমার সাফল্যতা ব্যর্থ হয়ে থাকবে। এরপর ভাই ঝন্টুকে জোর করে পিন্টু
নিয়ে বের হয়। অনেক লোকের ভিড় দেখে কি পিন্টু তুই আমাকে কোথায় নিয়ে এলি? এখানে তো লোকজনের
সমাগম। ভাইয়া তুমি এখানে যে লোকজন দেখছো সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
আমার জন্য অপেক্ষা করছে?
হ্যাঁ তোমার জন্য।
সবাই ঝন্টুকে অভিনন্দন জানাল। বড় একটা গেট তার থেকে পর্দা সরিয়ে ফিতা কাটে।
ঝন্টু অবাক হয়ে বলে, স্কুল! আমি স্বপ্ন দেখছি নাতো!
না ভাইয়া তুমি স্বপ্ন দেখছ না এটা বাস্তব। ভাইয়া তোমার অ্যাক্সিডেন্ট আমাকে বড় শিক্ষা দিয়েছে। আমি
তারপরে পড়ালেখা করেছি এই নয় তার সার্টিফিকেট।
একি বলছিস তুই?

হ্যাঁ, আমার পড়ালেখা শেষ করে তারপরে তোমাকে জানাবো এটাই ছিল আমার মনের ইচ্ছা। ভাইয়া আজ তুমি কি
খুশি? ভাইয়া আমার পড়ালেখা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা সবই তোমার আদর্শে আদর্শিত হয়ে আজ আমি এই পর্যায়ে
দাঁড়িয়েছি।
আমার ভাইয়ের সাফল্য দেখে সত্যি সত্যিই আমি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ছি। বাহ, আমার ভাইয়ের “জীবন তো
থেমে নেই”।
যাকে একদিন কেউ দেখতে পারতো না। এখন তাকে নিয়ে সবাই গর্ব করে। সবাই বলে, মানুষ পরিশ্রমী আর ইচ্ছা
শক্তির মনোবল থাকলে অসাধ্যকে সাধন করতে পারে। তেমনি পিন্টু ইচ্ছা আর সংকল্পের গতিতে আজ সে
সাফল্যর এই পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

www.bbcsangbad24.com