দেশ ও মানুষের কথা বলে

“থাকো তুমি সুখে” 

ফেব্রুয়ারী,০৬,২০২২

“সুলেখা আক্তার শান্তা”

ভার্সিটি চত্বরে বন্ধুদের আড্ডা। নিজেদের পারস্পরিক বিষয় নিয়ে কথা চলছে।
বন্ধুদের মধ্যে যে যাই বলুক আপনের কথাই বেশি গ্রহণযোগ্য। যেকোনো বিষয়ে
সিদ্ধান্ত হয় আপনের কথায়। বন্ধু শাকিল, নাদিম, অহিদ সহ বলে, তুই সঠিক
সিদ্ধান্তটা দিতে পারিস। আর পারিস বন্ধু মহলকে সবসময় প্রণয় প্রানোজ্জল করে
রাখতে। আরে না তোরা বাড়িয়ে বলছিস। তোদের আনন্দ দিতে পারে কিনা
জানিনা। বরং তোরদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে আমি খুব আনন্দ পাই। আপন বন্ধুদের
নিয়ে হই হুল্ল করা, রেস্টুরেন্ট খাওয়া, ঘোরাফেরা, গিটার বাজানো এভাবে সবাইকে
মাতিয়ে রাখে। বন্ধুদের আনন্দে মাতিয়ে রাখতে যেমন পারদর্শী পড়ালেখাতেও সে
খুব ভালো। বন্ধুদের সঙ্গে মাতামাতি পড়ালেখা নিয়ে সবার কাটছে ছন্দময় দিন।
একদিন বন্ধুদের নিয়ে মেতে আছে আপন। এমন সময় ভার্সিটিতে আগমন
নাজিয়ার। আপন আর নাজিয়া অপলক দৃষ্টি বিনিময় হয়। সুদর্শন আপন আর
সুন্দরী নাজিয়া সেই দৃষ্টিতে আটকে যায়। ভার্সিটির অনেকের চোখে পড়ে সেটা।
আপন আর নাজিয়ার মন উতল পাতাল হলেও দুজনার কেউ মুখ ফুটে কিছু বলে
না। প্রেমের আসন্ন জোয়ারে প্লাবিত হবার অপেক্ষায় দুজন। মেয়েরা মুখ ফুটে কিছু
বলতে না পারলেও ছেলেরা এ বিষয়ে এগিয়ে। নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা আপন।
একদিন বাইক চালিয়ে হাজির হয় নাজিয়া সামনে। নাজিয়ার মনে আপনের সরব
উপস্থিতির কল্পনাটি মিলে যায় নায়কের রোমাঞ্চকর আবির্ভাবের মতো। চোখেমুখে
প্রফুল্ল বিস্ময় নিয়ে তাকায়। আপন একগোছা ফুল এগিয়ে দিয়ে বলে, তোমার জন্য।
নাজিয়া সাগ্রহে ফুল হাতে নেয়। আপন এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে, আমি তোমাকে
ভালোবাসি। তুমি যদি আমাকে ভালোবাসো তাহলে আমার বাইকে ওঠো। মুহূর্তে
বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে এক রাশ উল্লাসে নাজিয়া উঠে বসে আপনের বাইকে।
আনন্দের জোয়ারে ভাসতে থাকে দুজন। দুজন ঘুরে ভার্সিটিতে চলে আসে।
ক্লাসে যায়। নাজিয়ার সঙ্গীরা বলে, বোঝা যাচ্ছে খুব আনন্দে আছিস। নাজিয়ার
লাজুক উত্তর, যা! তোরা না। এরপর আপন পবনে চলতে থাকে ভালবাসা। দুজনে
দেখা সাক্ষাৎ ঘোরাফেরা, চলতে থাকে অবিশ্রান্ত কথামালা। আপন আর নাজিয়া

দুজন দুজনকে ছুঁয়ে আজীবন একসঙ্গে থাকার প্রতিজ্ঞা করে। ভার্সিটি জীবন শেষ
হলে শুরু করবে নতুন জীবন। শুরু করবে স্বপ্নের বাস্তবায়ন। অভিভাবকদের নিয়ে
ঘটা করে করবে বিয়ের আয়োজন। আশা নিয়ে মানুষ বাঁচে, গতি আসে জীবনে।

আপনের বাড়ি থেকে বাবার ফোন আসে। জহির আহমেদ আপনের বাবা এলাকার
জনপ্রতিনিধি। বেশ নাম ডাক তাঁর। হঠাৎ শারীরিক অসুস্থ কারণে ছেলে আপনকে
ফোন করে। আপন বাবার ফোন পেয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। যাওয়ার আগে
ভালোবাসার মানুষ নাজিয়াকে জানায় ব্যাপার। নাজিয়া উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, হ্যাঁ তুমি
যাও। বাবার শরীরের প্রতি খেয়াল রেখো যেতে তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। আরো
বলে, তোমার ভালোবাসার মানুষকে হারাবার ভয় নেই, তোমার আমার সম্পর্ক
আছে আগামীতেও থাকবে নিশ্চিন্ত থাক তুমি।
আপন জানতে পারে তার বাবা অসুস্থতার কারণ স্থানীয় বিরোধ। আতিকুর রহমান
এলাকার উঠতি প্রভাবশালী ব্যক্তি। জহির আহমেদের ক্রয় করা একটি জমি নিয়ে
ষড়যন্ত্র করছে আতিকুর রহমান। জহির আহমেদের কথা টাকা দিয়ে জমি কিনেছে
সে। আতিকুর রহমান বলছে সম্পত্তিটি সরকারি খাস জমি। জহির আহমেদের ওই
সম্পত্তিতে দখল বেআইনি। জমির ব্যাপারে এলাকার লোকজনকে মিথ্যা উস্কানি দেয়
আতিকুর রহমান। জমিতে নির্মাণ কাজ করতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে আতিক রহমান।
আতিকুর রহমান বলে, তুমি চেয়ারম্যান বলে সরকারি জায়গা জোরপূর্বক দখল
করছো। গরিব দুঃখীর জায়গা একা ভোগ করতে চাও। এখানে কল-কারখানা হলে
গরিব দুঃখী মানুষ কাজ করতে পারবে। তারা ভালো থাকবে। তুমি সে জায়গায়
নিজের বাড়ি করতে চাও।
জহির আহমেদ ক্ষোভের সঙ্গে বলে, আমিও মানুষের কথা ভাবি। এই জমি আমার।
বাধা হয়ে দাঁড়াও কেন তুমি?
সরকারের জায়গা নিজের নামে কিনো কেন? হাজার মানুষের সুবিধা তুমি একা
ভোগ করতে চাও। সেই সুযোগ তোমাকে দেওয়া হবে না।
আমি নিজের টাকায় নিজে সুযোগ নিচ্ছি। আমি টাকা খরচ করেছি ভোগের প্রাপ্য
আমার।

তোমার অনেক টাকা আছে। একটা জমি ছুটে গেলে তোমার কিচ্ছু হবে না। এমন
পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে জহির আহমেদ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

আতিকুর রহমানের মেয়ে আনিকা। আপনের প্রতি বরাবরই তার দৃষ্টি ছিল। মনে
মনে আপনকে ভালবাসলেও তা প্রকাশ করা হয়নি। আনিকা সরাসরি বাবাকে বলে
ফেলে, বাবা আমি আপনকে ভালোবাসি। ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। আতিকুর
রহমান তাজ্জব হলেও ভাবতে থাকে মেয়ের কথা। আদরের মেয়ের এমন আবদার
কি করে মিটানো যায়। দ্বিধা সংকোচ ঝেড়ে ফেলে জহির আহমেদের কাছে প্রস্তাব
নিয়ে যায়। প্রস্তাব গ্রহণ করে না আপনের বাবা জহির আহমেদ। সরাসরি না বলে
দেয়। তোমার কারণে আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমার নিজের জমি বেদখল।
আমার শারীরিক অসুস্থতার কারণ তোমার কার্যকলাপ।
কৌশলী আতিকুর রহমান বলে, যে কারণে তোমার এত পেরেশানী তার একটা
সমাধান হতে পারে। আমি আর তোমার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াবো না। তুমি তোমার
স্বাধীন মতো কাজ করতে পারবে। আমার মেয়েকে তোমার ছেলের বউ করে নাও।
ছেলে-মেয়ের সম্পর্ক দিয়ে আমরা আত্মীয়তার সম্পর্কে আবদ্ধ হব। আত্মীয় কি
আত্মীয়ের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
জহির আহমেদ ক্ষোভের সঙ্গে বলে, নিজের টাকার কেনা সম্পদে তুমি লোকজন
ক্ষেপিয়ে তুলেছ আমার বিপক্ষে।
লোকজন যাতে তোমার বিপক্ষে ক্ষিপ্ত না হয় আমি সেই ব্যবস্থা করব। তুমি আমার
প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাও।
জহির আহমেদ ভাবে ছেলেকে তো কোথাও না কোথাও বিয়ে করাতে হবে। এখানে
বিয়ে করালে ঝামেলা ঝঞ্ঝাট মিটে যাবে। এলাকার প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ভারসাম্য
আসবে। ঠিক আছে আমি তোমার সঙ্গে আত্মীয়তা করতে রাজি।
আলহামদুলিল্লাহ। খুব খুশি হলাম। তাহলে সেই কথাই রইলো।
জহির আহমেদ ছেলেকে কথাটা জানায়। আপনের এক কথা, না। বাবা আমি এ বিয়ে
করতে পারবোনা। চিরাচরিত পৈত্রিক অহম আহত হয়। উত্তেজিত হয়ে বলে, বাপের
মুখের উপর কথা বলিস! এমন সন্তান না থাকলেও হবে। আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত
তুই আমাকে তোর মুখ দেখাবি না। মানুষ জানুক ছেলের কাছে বাবার ইচ্ছা-

অনিচ্ছার কোনো মূল্য নাই। অতিরক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে অসুস্থ জহির আহমেদ।
দুচোখে তার অশ্রু নেমে আসে। আপন বাবার এমন হৃদয়বিদারক অবস্থা দেখে
নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। এদিকে মনের সঙ্গে চলে যুদ্ধ। ক্লান্ত হয়ে একসময়
বলে, বাবা তোমার যা ভালো মনে হয় করো। জহির আহমেদ নিশ্চিন্ত হতে পারে না।
আপন পিতাকে আশ্বস্ত করে সে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। আপন ভালোবাসার
মানুষকে হারানোর ব্যথা বুকে চাপা দিয়ে নিজের কষ্টের কথা চেপে যায়।
জহির আহমেদ আর আতিকুর রহমানের ছেলে-মেয়ের বিয়ে হয় মহা ধুমধামে।
আনিকার স্বপ্ন বস্তব হয়। স্বামী হিসেবে পায় আপনকে। আনিকার উচ্ছ্বাস আর
আপনের ভারাক্রান্ত হৃদয়ের গোপন ব্যথা নিয়ে শুরু হয় তাদের সংসার।
জহির আহমেদকে নিজের জমি ভোগ দখল করতে দেয়নি। তার বিরুদ্ধে
লোকজনকে নানা নীতিবাক্য বলে খেপিয়ে তুলছিল। আজ নিজের মেয়ে বিয়ে দিয়ে
আতিকুর রহমান চুপ হয়ে যায়। স্বার্থ হাসিলে পারদর্শী আতিকুর রহমান তৃপ্তির
নিঃশ্বাস ফেলে।

আপনের কোন খোঁজ খবর দীর্ঘদিন পায়না নাজিয়া। কোন ভাবে যোগাযোগ করতে
পারে না। নাজিয়া আপনের সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে আপনের বাড়িতে
আসে। এসে জানতে পারে আপনের বিয়ে করেছে। হৃদয় তার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।
আপনকে হারানোর ব্যথায় ক্ষত-বিক্ষত মন নিয়ে আপনের সম্মুখে দাঁড়ায়। চিৎকার
করে কেঁদে বলে আপন এ তুমি কি করলে? আপন কেন তুমি আমার আপন হতে
পারলে না। আমি কি আশায় বাঁচব বলতে পারো। তুমি সুখে-শান্তিতে সংসার করবে
আর আমি হৃদয় ভাঙ্গার বেদনা বয়ে বেড়াবো। আপন আমাকে রেখে তুমি অন্য
কাউকে জীবনসঙ্গী করলে এটা জানার আগে আমার মৃত্যু কেন হলো না!
আপন মরিয়া হয়ে বলে কেন কি পরিস্থিতিতে তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। বাবা
ছেলেকে তাঁর মৃত্যুর কথা বলে! তুমি বলো তোমার মৃত্যুর কথা! তাহলে আমার কেন
মৃত্যু হলো না! আপন আমি তোমাকে আপন করে পেতে চাই। এছাড়া আমি আর
কিছু চাইনা। আপন আমি যে তোমাকেই চাই। নাজিয়া অসংলগ্ন কথায় আবেগ
প্রকাশ করতে থাকে। আপনের কাছে সান্ত্বনার ভাষা নাই তবুও বলে, আমি এই জন্মে
তোমার না হলেও পরজনমে যেন তোমার হই। নাজিয়া আমি ঘর সংসার করবো
ঠিক। কিন্তু তুমি থাকবে আমার অন্তরে। তোমায় ছাড়া আমি জীবন্ত মূর্তি হয়ে বেঁচে

থাকব। নাজিয়ার কথা শেষ হতে চায় না একনাগাড়ে বলে চলে। তুমি কিছু না হলেও
আমার জীবন ব্যথায় ভরে দিয়েছ। এই পৃথিবীতে তোমার দেওয়া ব্যথা নিয়ে
তোমার দৃষ্টির আড়ালে বেঁচে থাকব। পাবে না আর তুমি আমার দেখা। থাকো তুমি
সুখে।
আপন ভাবে তার নাজিয়াকে আটকানোর কোন পথ নাই। হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে
আপন। কারণ তার ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ার যন্ত্রনায় বুক ঝাঁঝরা করে
দিচ্ছে। আনিকা আড়াল থেকে আপন আর নাজিয়ার সব কথা শুনে। কেঁদে বলে,
আমার স্বামীর মনে অন্য নারী বসতি। স্বামীর হৃদয়ে আমার কোন স্থান নেই। কিন্তু
আমার অন্তরে ভালোবাসা তোমার জন্য। আপন আমি যে তোমাকে পাগলের মতো
ভালোবাসি। তোমার ভালোবাসা না পাওয়ায় আমার অন্তরেকে কুরে কুরে খাবে।
একই ছাদের নিচে আমরা থাকবো। বউ হিসাবে স্বামীর ভালোবাসা পাবো না। আমি
যে বড়ই হতভাগী। আনিকা বুঝতে দেয় না আপন আর নাজিয়ার সে কথা শুনেছে।
মনেই রেখে দেয় ওদের দুজনার কথোপকথন।
জহির আহমেদের জমি ছুটে যায়। কারণ শেষে প্রমাণিত হয় সেটা সরকারি জমি।
জহিরের বাড়ি ভেঙ্গে চুরে জমি দখলে নেয় সরকার। সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে
যায়।

নাজিয়া ভার্সিটিত চেঞ্জ করে অন্য ভার্সিটিতে ট্যান্সেফার হয় যাতে আপনকে আর
দেখতে না হয়। আপনের কাছ থেকে দূরে থাকাই মঙ্গল। আপনকে আপন করে না
পাওয়ার বেদনা তাকে ক্ষতবিক্ষত করে প্রতিমুহূর্তে। তিনটি মানুষকে হৃদয়ে বয়ে
চলা নিঃশব্দ ঝড় নিয়ে কাটাতে হবে জীবন। আপনের মতো করে জীবন ধারন
করেও ইহজনমে কেউ কারো আপন হতে পারে না।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.