দেশ ও মানুষের কথা বলে

সুলেখা আক্তার শান্তা’র গল্প “প্রান্তের পরবাস,,

ফেব্রুয়ারী,২৮,২০২২

“সুলেখা আক্তার শান্তা”
“প্রান্তরে পরবাস,,
কানিজ গরীব ঘরের সন্তান হলেও উচ্চাভিলাষী মন তার। জীবন সংসারের সীমাবদ্ধতা সে মানতে চায় না। গরিব বাবাকে তার চাওয়া পাওয়ার কথা বলে। আমাকে দামি খাবার, দামি পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা দেও না তোমরা। সন্তানের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা বাবা-মার কর্তব্য। আজিজ আহমেদ অসহায়ের মতো মেয়ের কথা শুনে। কোন কথা বলে না কেন? কানিজ বাবাকে বলে, কি, কথা না বলে শুধু শুনলে হবে?
মারে কি বলবো। তোর বাবার সাধ্য নাই তোর ইচ্ছা পূরণ করার! আমার সামর্থের সবটুকুই তো তোর পেছনে খরচ করি। সন্তানকে সুখে রাখতে কোন বাবা-মার না ইচ্ছা করে।
তুমি কি সুখে রাখছো? কোনো সাধ আহ্লাদই তো পূরণ করতে পারিনা! কানিজের অসহিষ্ণু কথায়। মা হোসনারা এগিয়ে আসে। তুই বাপের সঙ্গে এভাবে কথা বলছিস কেন? এমন কথা বলতে একবারও মুখে আটকালো না! গরীবের ঘরে জন্মেছিস সুখ পাবি কোথায়! সুখ কপালে থাকতে হয়।
মা তুমি এমন কথা বললা আমাকে? আমার কপালে সুখ আছে তা আমি তোমাকে প্রমাণ করে দেখাবো। নিজেকে সুখে রাখতে কৌশল অবলম্বন করতে হয়। এই আমি চললাম, থাকবো না আর এই বাড়িতে। কানিজ ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়। হোসনারা মেয়েকে ধরে বলেন, কোথায় যাচ্ছিস মা? তুই আমাদের একমাত্র সন্তান। বাবা-মাকে রেখে কোথাও যাইস না।
তোমরা আমাকে নিয়ে তোমাদের স্বার্থ দেখছো।
কি বলিস তুই!
সন্তান না থাকলে তোমাদের মনে কষ্ট লাগবে, সেই কথা ভাবছ, সন্তানের কথা ভাবছ না। একথা বলে কানিজ বের হয়ে যায় বাড়ি থেকে। যে বাবা-মা সন্তানকে সুখ দিতে পারেনা সে বাবা-মার কাছে থেকে নিজের ভবিষ্যত নষ্ট করতে চাই না। আজিজ আহমেদ মেয়েকে পিছনে থেকে ডাকতে থাকে, মা বাড়িতে ফিরে আয়।
কানিজ আর বাড়িতে ফিরে না। টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় চলে আসে। এক বড়লোকের বাড়িতে কাজ নেয়। অহিদ গৃহকর্তা, ঘরে তার শয্যাশায়ী অসুস্থ স্ত্রী। মূলত তার দেখাশোনা জন্যই কানিজকে রাখা হয়। ছেলে রাফিন কলেজে পড়ে, সে থাকে তার পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত। অহিদ অফিসে চলে যায়। বাসায় থাকে শুধু অহিদের অসুস্থ স্ত্রী রোজী। অহিদ যতটুকু সময় বাসায় থাকে কানিজ তার পাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। সুন্দর জামা কাপড় পড়ে সেজেগুজে থাকে সবসময়। অহিদের প্রয়োজনীয় জিনিস সামনে থাকলেও আগ বাড়িয়ে এগিয়ে দেয় কানিজ। সবকিছু একটু বেশি করে অহিদের জন্য। অহিদের সঙ্গে হেসে কথা বলে। অহিদ অফিস থেকে ফিরে আসার আগে ফিটফাট হয়ে থাকে কানিজ। কথার সুরে আহ্লাদীপনা। অহিদ একসময় বিষয়টি লক্ষ্য করে। কানিজের আচরণে পরিবর্তন আসে। গৃহকর্ত্রীর মতো আচরণ শুরু করে সে। অসুস্থ রোজী বিছানায় শুয়ে থেকে দেখে। তার সহ্য হয় না কানিজের এইসব কীর্তি। তার স্বামীরও কানিজের ব্যাপারে এমন উদাসী ভাব দেখে সে খুব কষ্ট পায়। রোজি কথা বলতে পারেনা, স্ট্রোকের কারণে তার বাকশক্তি রুদ্ধ হয়ে গেছে। এই বিষয়টি ছেলে রাফিনকে ইশারা-ইঙ্গিতে বলে। রাফিন লক্ষ্য করেলে বুঝতে পারে বিষয়টি। বাবার সাথে ঢং করা দেখে সরাসরি বলে ফেলে। আপনাকে এই বাসার কাজ করতে হবে না। আপনি চলে যান। অহিদও ছেলের কথায় কানিজকে কাজ থেকে বিদায় করতে চায়।
কানিজ ভাবে এমন স্বর্গরাজ্য ছেড়ে কোথায়ও যাবে না। সে কৌশলী হয়, বলে, আমার যদি ভুল হয়ে থাকে আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমাকে ভুল শোধরাতে দাও। সঙ্গে একটু অশ্রুপাত। সুন্দরী মেয়েদের অশ্রুতে সবাই বিগলিত হয়। ছেলে রাফিনের বেশি বেশি যত্ন নেয়, বাবা বলে ডাকে। সকলে ভাবতে থাকে কানিজকে ছাড়া চলবে না। রাফিনের সামনে তার মায়ের যত্ন নেয়। আড়ালে হলে বিরূপ অবহেলা। রোজীর গাল টিপে বলে, তুই আমাকে তাড়াতে চেয়েছিলি? রোজীর গালে অনেক গুলি থাপ্পর মারে।
রোজী অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারেনা। তার হাত-পা অক্ষম, মুখেও কথা বলতে পারে না। কানিজকে বলে, তুই মরে যা। তাহলে আমি হব এই বাড়ি রাজ রানী। রোজী অসহায়ের মতো দু’চোখের পানি ছাড়তে থাকেন।
রোজী দিনের পর দিন স্বামীর সঙ্গে কানিজের রং ঢং দেখছিলেন। ভয়ে ছেলেকেও কিছু বলতেন না। যদি তাকে মেরে ফেলে। রাফিনকেও হাত করে নিয়েছে কানিজ তার ছলাকলা কৌশল দিয়ে। হঠাৎ একদিন অনেক কষ্টের বোঝা নিয়ে রোজী মৃত্যুবরণ করেন।
কানিজ ভাবতে থাকে, কে ঠেকায় তাকে পূর্ণ রাজত্ব করায়ত্ত করা থেকে। সুন্দরী কানিজ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কৌশল বোঝে। অহিদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সবসময় নিজেকে আবেদনময়ী করে রাখে। কানিজের রুপে অহিদও একসময় মজে যায়। কানিজ বলে, অর্থ-সম্পদের না থাকলেও প্রেম ভালোবাসায় দিকে কোন অংশে কম নাই আমার।
প্রেম ভালোবাসায় তুমি যে ভরপুর তাতো আমি দেখছি। আমার মতো একজন বুড়োলোককে ঠাই দিবে তোমার হৃদয়?
ঠাই আর দিবো কি? পুরো হৃদয় জুড়ে আছেন আপনি। আর আপনি বয়সের কথা বলছেন। আমার কাছে আপনার বয়সের কোনো সমস্যা না। আর আপনেকে দেখলে মনে হয় আপনার বয়স ৩০ শের বেশি না।
আহ কি যে বলোনা তুমি! তোমার কথায় মনে হয় আমার বয়স ত্রিশ।
হ্যাঁ আমিও তো তাই বলি। তাহলে আপনে আমাকে বিয়ে করেন?
তুমি চাও এই বুড়ো লোকের সংসার করতে?
আপনি আর নিজেকে বুড়ো বলবেন না!
বলবো না, এই তোমাকে বললাম।
তোমার করে পেতে হলে আমাকে বিয়ে করে নাও!
হ্যাঁ আমার হৃদয়ের বন্ধনে আটকাবো তোমাক শিগগির।

অহিদ বিয়ে করে কানিজকে। কানিজ বিয়ের দিন রাতেই তার চাহিদা, শর্তের কথা সরাসরি বলে দেয়। তোমার তো ঢাকায় তিনটা বাড়ি। এই বাড়ি তিনটা তুমি আমার নামে করে দাও।
হ্যাঁ তোমার নামে আমি লিখে দেবো বাড়ি। তবে তিনটা নয় একটি বাড়ি। দুটি থাকবে আমার ছেলের নামে।
হঠাৎ করে কানিজ স্বমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করে। ক্রুদ্ধ স্বরে বলে, আরে বুড়ো তোকে আমি বিয়ে করছি কি এজন্য। আমি বিয়ে করেছি তোর এই বাড়ি জন্য!
আরে তুমি আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছো কেন? এ তোমার কেমন ভাষা!
আমি তোর মতো বুড়াকে ভালোবাসা দিব তার বিনিময় তুই আমাকে তোর বাড়ি লিখে দিবি।
তোমার মধ্যে আমার জন্য কোন ভালোবাসা নাই! এখন আমি বুঝতে পারছি।
এটা আগেই বোঝা উচিত ছিল, বুড়া কোথাকার। বাড়ি নিয়ে দু’জনের মধ্যে খুব কথা কাটাকাটি হয়। কানিজ এমন ভয়ানক রূপ না দেখিয়ে ভালো করে বললে অহিদ তাকে বাড়ি দিত। কানিজের ভয়ানক রূপ ধারনের কারণে অহিদ ও শক্ত হয়ে যায় সে কানিজের নামে কিছু লিখে দিবে না। কানিজ বাড়ির কথা বললে, অহিদ বলে, সময় হলে তুমি তোমার ভাগেরটা পাবে।
আমার দোয়ানি হিসাবে ভাগেরটা দিয়ে কি করব? আমার চাই পুরোটা! সম্পদ নিয়ে দ্বন্দের মাঝেই পার হয় বৎসর। জন্ম হয় তাদের কন্যা সন্তান। কানিজ নিজের নামে লিখিয়ে নিতে পারে নাই বাড়ি। অহিদ মৃত্যুবরণ করেন। কানিজ পুরো সম্পত্তি নিজ দখলে রেখেছে। রাফিনকে সম্পত্তি ভোগ করতে দেয় না। রাফিন ভাবে, আমার সম্পত্তি আমাকে ভোগ করতে দেয় না। আইনগত ভাবে সম্পত্তি আমার। পিতার স্ত্রী এবং তার কন্যার অংশ হিসেবে প্রাপ্য অংশটুকুই তারা ভোগ করবে। এর বেশি করবে না। রাফিন নিজের সম্পত্তি নিজে বুঝে নেয়। কানিজ ভাবে, একি হলো তার। বেশি করতে গিয়ে হারাতে হলো বাড়ি। কানিজ রফিনকে বলে, আমি তোমার মা এখনো জীবিত আছি, আমি তোমার বিষয় সম্পত্তি দেখাশুনা করব। তোমার এদিকে খেয়াল না রাখলেও চলবে। কানিজের কথা মতো সম্পত্তি দেখা শোনার ভার তাকে দেয় রাফিন। কানিজ ভাবে, মুখে রস না থাকলে দুনিয়ায় চলে যায় না। ছলাকলা দিয়ে সম্পত্তি হাত করে নিয়ে নিলাম। কানিজ অর্থ-সম্পদ করায়ত্ত করে উৎশৃংখল হয়ে ওঠে। বাসার মধ্যে পর পুরুষ নিয়ে আড্ডা দেয়। মানুষ নানান কথা বলে, তাতে কানিজ পরোয়া করে না।
রাফিন বলে, এভাবে বাসার মধ্যে পরপুরুষ কাউকে আপনি আনতে পারবেন না!
এটা তোমার আমাকে বলতে হবে না। আমার ব্যাপার নিয়ে আমি বুঝবো।
এখানে আপনার ব্যাপার কিভাবে দাঁড়ায়, আমার বাবার মান-সম্মান নিয়ে খেলছেন! আপনি যে কার্যকলাপ করছেন এটা এখানে কিছুতেই চলবে না।
কানিজ হাসতে হাসতে বলে, আরে তুমি তো বড় বেড়ে যাচ্ছ। এটা কিভাবে কমাতে হয় তা আমি জানি।
আপনি ভয় দেখাচ্ছেন। আমি ভয় পাই না।
ভয়ের কাজ বাস্তবে করে দেখাতে পারি।
আপনার সাথে কথা বলার আমার সময় নাই। আমার সম্পওি আমি আর দিচ্ছি না আপনাকে। রাফিন বিয়ে করে সুমিকে। সুমিকে নিয়ে রাফিন তার পুরান ঢাকার বাড়িতে থাকে।
কানিজের মেয়ে তাহানা বড় হয়েছে। তাহানা খুব ধার্মিক। সে থাকে সবসময় রোজা নামাজ নিয়ে। মায়ের চলাফেরায় তাকে খুব কষ্ট দেয়। চোখের সামনে মায়ের বিভিন্ন কীর্তিকলাপ দেখে বীতশ্রদ্ধ। মাকে কোনভাবে বারণ করতে পারে না সে।

কানিজ নিজের চেয়ে কম বয়েসি ছেলে নাদিমের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। নাদিমের বয়স আঠারো কি বিশ। ঘনিষ্ঠতা গভীর হয়। নাদিমকে বিয়ে করে কানিজ। তাহানা বিরক্ত কন্ঠে, মা তোমার হাঁটুর বয়সী ছেলেকে বিয়ে করলে! একবারও ভাবলেনা তার আর তোমার বয়সের পার্থক্যের কথা।
আমার বয়স হয়েছে তাতে কি! মনে আমার ভালোবাসা আছে।
মা আমি এসব কথা শুনতে চাই না!
কানিজ বিভিন্ন জায়গায় নাদিমকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের দিন আনন্দ উল্লাসে কাটতে থাকে। নাদিম কানিজকে স্ত্রী পরিচয় দিলে লোকজন অবাক হয়! নাদিম বুঝতে পারে দু’জনের বয়সের পার্থক্যের কথা। লোকে বলে, এ বয়স্ক মহিলা ছেলের বয়সী ছেলেকে বিয়ে করেছে। লোকজনের মুখে নানা কথা শুনে। কানিজের জন্য মানুষের কাছে লজ্জিত হতে থাকে নাদিম। এতে নাদিমের মন উঠে যায় কানিজের উপর থেকে। নাদিম চলে যায় তার গ্রামের বাড়ি। আস্তে আস্তে যোগাযোগও বন্ধ করে দেয়। নাদিম সম্পর্ক রাখে না কানিজের সঙ্গে। কানিজ ভেঙ্গে পড়ে।
তাহানা মায়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। মায়ের স্বেচ্ছাচারী চলাফেরার বারণ করতে না পারে মনোকষ্টে ভোগে। সে নিজেকে নিজের মতো করে রাখে। তাহানা ইবাদাত নিয়ে থাকে। ধর্ম-কর্ম রোজা-নামাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে সে।
কানিজ নিঃসঙ্গতায় ভোগে। তার সম্পদ আছে মনে সুখ নেই। বিয়ে করল, স্বামী তাকে ফেলে চলে গেছে। মেয়ে তার সঙ্গে কথা বলে না। সব নিয়ে হতাশায় তাকে ঘিরে রেখেছে। চিন্তা করে নিজের মর্জি মাফিক চলতে গিয়ে সে আজ সব হারিয়েছে। সবকিছু থেকেও আজ কিছুই নেই। নিঃসঙ্গতা হয়েছে তার বড় আপন।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.