দেশ ও মানুষের কথা বলে

দেনমোহর ও সমাজে প্রচলিত ধারনা

মার্চ৩০২০২২
এডভোকেট ডি.এইচ.তুহিন:

মুসলমানদের বিবাহ হল একটি সামাজিক চুক্তি। চুক্তি সম্পাদনের অন্যতম শর্ত দেনমোহর। মোহর বা দেনমোহর হল সম্পত্তি বা নগদ টাকা বা কোন সম্পত্তি যা বিবাহের প্রতিদান স্বরুপ স্বামীর নিকট হইতে স্ত্রী পাওয়ার অধিকারী।

ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে এই পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স:) দেনমোহরের প্রচালিত প্রথাকে যুক্তি ও ন্যায়নীতির উপর দাড় করিয়েছেন। মুসলিম আইনে দেনমোহরের একমাত্র মালিক হিসাবে অধিকার দেয়া হয়েছে স্ত্রীকে।

প্রখ্যাত আইনবিদ ডি.এফ মোল্লা দেনমোহর সম্পর্কে বলেন, “মোহর বা দেনমোহর হল কিছু টাকা বা অন্য কিছু সম্পত্তি যাহা বিবাহের প্রতিদান স্বরুপ স্ত্রী স্বামীর নিকট হইতে পাওয়ার অধিকারী।”

দেনমোহরকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যার একটি ত্বরিত, আশু (মুয়াজ্জল) অপরটি বিলম্বিত, স্থগিত (মু-আজ্জল)। মুয়াজ্জল দেনমেহার বিয়ের সময় বা সাংসারিক জীবন চলাকালীন সময়ে দেনমোহরের যে অংশটুকু চাহিবামাত্র স্ত্রীকে স্বামী পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে। মু-অজ্জল দেনমোহর একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর বা যেখানে মেয়াদ নির্ধারিত নাই সেক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুর পর বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের পর স্ত্রী স্বামীর নিকট থেকে পায়।

দেন মোহরের পরিমাণ নির্দিষ্ট করা নাই। দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে কনের পরিবারের মহিলা সদস্যদের দেনমোহরের পরিমাণ বিবেচনা করে বা কনের পিতার আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে বরের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়।

বিবাহের তারিখ নির্ধারনের সময়ই বর ও কনে পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে উভয় পক্ষের সম্মতিতে ধার্য্য করেন। বর নিজেই এই চুক্তি করতে পারে। দেনমোহরের অর্থ বিবাহের পূর্ব বা বিবাহকালে কিংবা বিবাহের পরে নির্দিষ্ট করা চলে। (কায়মনন্নেসা বনাম হালিমা বিবি) এবং বিবাহের পর উহার পরিমাণ বৃদ্ধি করাও যাবে। (জহুর বিবি বনাম সোলেমান খান।)

নাবালক সন্তানের পক্ষে পিতা দেনমোহরের চুক্তি সম্পাদন করলে তাহা পুত্রের উপর বাধ্যকর হইবে। স্বামী কর্তৃক দেনমোহর পরিশোধ করা হইবে মর্মে নিশ্চিত করা ব্যক্তি স্ত্রীর নিকট জামিনদার হিসাবে দায়ী থাকিবে। (মোসাঃ ফাতেমা বিবি বনাম আলামিন)।

সুন্নী আইনমতে, দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ না থাকলে দেনমোহরের অংকের একটি ন্যায্য অংশ মুয়াজ্জল দেনমোহর হিসাবে সুন্নী আইনে বিবেচিত হবে। তবে মতবিরোধের ক্ষেত্রে আদালতের এখতিয়ার থাকে দেনমোহরের যে অংশ স্থগিত তাহা নির্ধারণ করা। নারীর সামাজিক অবস্থা দেনমোহরের পরিমাণ এবং প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আদালত দেনমোহরের অংশ নির্ধারণ করেন।

দেনমোহর মওকুফের বিষয়টি একমাত্র স্ত্রীর সম্মতির উপর নির্ভর করে। স্ত্রী ইচ্ছা করলে স্বামী বা স্বামীর উত্তরাধিকারীদের পক্ষে সম্পূর্ণ বা আংশিক দেনমোহর প্রতিদান ব্যতীত মওকুফ করে দিতে পারে। স্ত্রী স্বামীর মৃত্যুতে ভারাকান্ত হয়ে দেনমোহর মওকুফ তা তার জন্য বাধ্যতামূলক নাও হতে পারে।

নাবালক স্ত্রীর দেনমোহর মওকুফ অবৈধ। দেনমোহর যাই থাকুকনা কেন স্বামী নিজ উদ্যোগে মোহরানা বৃদ্ধি করতে পারে। স্ত্রী তার দেনমোহরের টাকা না দিলে সে এবং তার মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীগণ এর জন্য মামলা করতে পারবে।

আমাদের সমাজে কতক লোক প্রচার বা প্রকাশ করে বেড়ায় স্ত্রী তালাক দিলে স্ত্রী দেনমোহর পাবে না বা অর্ধেক দেনমোহর পাবে। তা সঠিক নয়। তবে স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করলে স্ত্রী অর্ধেক মোহরানা পাবে। দাম্পত্য মিলন হয়েছিল কিনা তা প্রমাণের ভার স্ত্রীর। যদি স্বামী দাম্পত্য মিলনের পূর্বেই মারা যায় তাহলে স্ত্রী সম্পূর্ণ মোহরানা পাবে।

দেনমোহরের ঋণের জন্য মৃত মুসলমানের উত্তরাধিকারীগণ ব্যক্তিগত ভাবে দায়ী না হলেও প্রত্যেক উত্তরাধিকার তাদের প্রাপ্য অংশের আনুপাতিক হারে মৃতের দেয় দেনমোহরের জন্য উত্তরাধিকারীগণ দায়ী থাকবে কিংবা দেনমোহরের জন্য স্বামীর সম্পত্তি দখলে রাখলে উত্তরাধিকারীগণ নিজেদের প্রাপ্য অংশের আনুপাতিক হারে দেনমোহরে ঋণ পরিশোধ করার জন্য পৃথক ভাবে স্ব-স্ব অংশ উদ্ধার করার অধিকারী হবে।
( চলমান ….)

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.