দেশ ও মানুষের কথা বলে

“অশান্ত মন”

আগস্ট,১০,২০২২

“সুলেখা আক্তার শান্তা”

রুনার যখন বিয়ে হয় তখন তার বয়স নয় কী দশ আর স্বামী অনিকের বিশ কী একুশ। দশ বছরের মেয়ের যতটুকু বুঝ
থাকে রুনার তখনো তা হয়নি। স্বামী অনিকের বাড়ি রুনা কান্নাকাটি করে। আমি এখানে কেন থাকবো বাবার বাড়ি
যাব। শ্বশুরবাড়ির সবাই তাকে আদর করে। কেউ ভালোবেসে কোলে নেয়, কেউ খেতে দেয়, কেউ বা বিভিন্ন খেলনা দেয়
কিন্তু রুনা তাতে শান্ত হয় না। তার একই কথা আমার মা বাবা কই? আমি তাদের কাছে যাবো। অনিক রুনার জন্য
অনেক কিছু কেনাকাটা করে আনে। অনিক যত কিছুই দিক, যতই আদর করুক তাতে রুনার মন  শান্ত হয় না। রুনা
বুঝতে পারে এই লোকটার জন্যই তাকে এই বাড়িতে থাকতে হচ্ছে। অনিক কে দেখলে রুনা বলে, আপনি আমার কাছে
আসবেন না। অনিক হেসে বলে, ঠিক আছে আসবো না। শুনে রুনা খুশি হয়। রুনার খুশিতে অনিকও খুশি হয়। অনিক
ভাবে তার বালিকা বধূ কিছু বোঝেনা। অনিক অফিসে যাওয়ার সময় রুনার সবকিছু করে রেখে যায়। গোসল খাওয়ার
তত্ত্বাবধন থেকে শুরু করে খেলনা গুছিয়ে দেওয়া পর্যন্ত। অফিসে থাকলেও রুনার কথা চিন্তা করে। বাসায় কতখনে আসবে
সেই ভাবনায় অস্থির হয়ে থাকে। ফেরার পথে রুনার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসে। কিন্তু কিছুতেই রুনার মন পায় না।
তাতে আফসোস নেই নিজেই বুঝ নেয়, রুনা ছোট। রুনার অনেক খেলনা, অনেক জামাকাপড়। মা মাজেদা ছেলেকে বলে,
বাবা বৌমার তো অনেক কাপড় চোপড়, খেলনা অনেক আছে আর কিছু কিনিস না। এগুলো শেষ হোক পরে আবার
কিনিস। মা ওগুলো পেলে যদি রুনা একটু ভালো থাকে ওটাই আমার স্বস্তি। রুনার প্রতি মনের মনি কোঠায় সঞ্চারিত
ভালোবাসা প্রকাশে কুন্ঠা বোধ করে।
রুনা বাবার বাড়ি গেলে আর ফিরতে চায় না শ্বশুর বাড়ি। ওইটুকু বয়সে স্বামী শ্বশুরবাড়ির বুঝটা তার মধ্যে
স্বাভাবিকভাবে আসেনি। বিয়ে যখন হয়েছে শ্বশুরবাড়ির থাকায় অভ্যস্ত গড়ে তুলতে চায় গুরুজনরা। রুনার স্বাভাবিক
স্বাচ্ছন্দ ব্যাহত হয়। শিশু মনে বিদ্রোহ পুঞ্জীভূত হতে থাকে। প্রচ্ছন্ন বন্দীত্বের চেতনায় বাড়তে থাকে ক্ষোভ। বিয়ের ক'বছর
পরেও স্বামীর বাড়ির প্রতি তার কোন টান নেই। সে কিছুতেই স্বামীর বাড়ি থাকতে চায় না। বাবার বাড়ি এলে শ্বশুরবাড়ি
থেকে কেউ নিতে এসেছে টের পেলে পালায়। বাবার বাড়ির মানুষ জোর করে তাকে স্বামীর বাড়ি দিয়ে আসে। পুরো রাস্তা
রুনা কান্নাকাটি করে। মাজেদা বউয়ের এমন পাগলামি দেখে খুবই বিরক্ত হয়। রুনা একটু বড় হলে, বাবার বাড়ির রাস্তা
চিনায়, পালিয়ে যায় বাবার বাড়ি। শ্বশুর বাড়ির লোকজন রুনাকে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারে সে তার বাবার
বাড়ি আছে। দিন মাস বছর যতই যাক তার মধ্যে মুরুব্বিদের ভাষায় বয়সে পরিপক্কতা আসেনা। তার স্বভাবকে
শিশুসুলভ আচরণ বলেই মনে করা হয়। রুনা কিছুটা বুঝতে পারায় তার বন্দীত্বের কারণ নির্ণয় করে। কাউকে কিছু না
জানিয়ে অনিক কে সে ডিভোর্স পাঠায়। অনিক ডিভোর্স লেটার পেয়ে অবাক! অনিকের মা মাজেদা তা জানতে পেরে বলে,
তার মতে, যখন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ মেয়েকে আর ঘরে তোলা যাবে না। রুনার এমন সিদ্ধান্ত অনিকের পরিবারের
মান সম্মানে আঘাত করে। অনিক ডিভোর্সে পেপারে সই করতে না চাইলেও তার পরিবারের সিদ্ধান্তে ডিভোর্সে সই করতে
হয়। রুনার পরিবার মেয়ের এমন সিদ্ধান্ত জেনে হতবাক! কিন্তু যখন তারা জানে তখন তাদের কিছুই করার থাকে না।
রুনার মনে জেদ এবং ক্ষোভ সময় প্রবাহে প্রশমিত হয়। জীবন অন্যরূপে ধরা দেয় তার সামনে। ধীরে ধীরে অনিকের
কথা মনে পড়ে। বুকের ভেতর অনুভব করে রোমঞ্চিত অনুভবের দোলা। তার মনে সৃষ্টি হয় অনিকের জন্য ভালোবাসা।
মনে পড়ে শ্বশুরবাড়ির আদর যত্ন ভালবাসার কথা। মনে করে ভুল করেছে সে। অনুতাপ বাড়তে থাকে মনে। হৃদয়ে
ব্যাকুলতা বাড়তে থাকে অনিকের জন্য। কাউকে কিছু না জানিয়ে অনিকের বাড়িতে উপস্থিত হয় সে। দেখে একটি মেয়ে
অনিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি অনিকের দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়। রুনা অনিকের হাত ধরে
সরিয়ে আনতে চায় মেয়েটির কাছ থেকে। এই তুমি, অনিকের কাছে এসে দাঁড়িয়েছ কেন? মেয়েটি কোন কথা বলে না,
অনিকের দিকে তাকায়। পৃথিবীর কোন শূন্যস্থান অপূর্ন থাকেনা। অনিকের জীবনে অলক্ষ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে রুনা শূন্য
আসন। অনিক বিয়ে করেছে  স্ত্রী সায়মাকে নিয়ে করছে সংসার।

অনিক বলে, ওই তো আমার কাছে দাঁড়াবে কারণ আমরা দুজন স্বামী স্ত্রী। একথা শোনার পর রুনার মনে হলো তার স্বপ্নের
পৃথিবী ভেঙেচুরে চুরমার হয়ে গেল। সে অনিক কে বলে, না অনিক তুমি আমার ছাড়া অন্য কার হতে পারো না! আমিও
তোমার ছাড়া অন্য কারো হতে পারি না!
অনিক বলে, সে রাস্তা তো তুমিই বন্ধ করে দিয়েছো। এখন তুমি যা চাও সেটা আর হবার নয়!
রুনা বলে, না অনিক আমি এটা কখনোই মানতে পারবো না। তুমি আমার না হলে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা আমার অর্থহীন
হয়ে পড়বে।
সায়মা দেখে তার স্বামীকে পেতে চায় অন্য একজন নারী। এটা তার সহ্য হয় না। সায়মা বলে, অনিকের যদি কোন স্ত্রী
থাকে সেটা আমি, অনিকের  ভালোবাসা যদি কেউ পায় সেটা পাব আমি। এখানে অন্য কোন নারীর স্থান নেই।
রুনা বলে, অনিক তুমি আমার কী ছিলা এখন আমি বুঝতে পারছি। যেই রুনার হাসিমুখ দেখতে তুমি কতকিছু করেছো
আজ সেই রুনা কিছুই চায় না, শুধু তোমাকেই চায়। তোমাকে না পেলে রুনা মরে যাবে! আমি না বুঝে যে সিদ্ধান্ত
নিয়েছিলাম, আজ যে সেই সিদ্ধান্তে আমার জীবন তছনছ করে দিলো।
অনিক বলে, আমার স্ত্রী এখন আমার পৃথিবী। এখানে আর কারো ঠাঁই নাই। আমি জীবনের মাঝে কোন দেওয়াল সৃষ্টি
করতে চাই না। তাই তুমি চলে যাও।
সায়মা বলে, শুনলেন তো আমার স্বামী কী বলল?
রুনা বলে, স্বামী বলবে না। আমার ভুলের কারণে তুমি অনিকের স্ত্রীর আসন দখল করতে পারেছো। ভুল না করলে
অনিকের হৃদয়ে থাকতো আমার বসতি। সেখানে তুমি কখনোই প্রবেশ অধিকার পেতে না। রাত হয়ে যায় রুনা অনিকের
বাড়ি থেকে যাবার নাম করে না। অনিক রুনার বাড়ির লোকজনকে খবর পাঠায়। তারা এসে রুনাকে বুঝিয়ে বাড়ি নিয়ে
যায়। যাবার সময় রুনা চিৎকার করে বলে, অনিক তুমি আমাকে যেতে দিও না। আমি যে তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না।
রুনা আর অনিকের কোনভাবেই এক হওয়া সম্ভব না! রুনা বাস্তবতা মেনে নেয়। অনিকের বাড়িতে আর যায় না। কিন্তু
অনিকের জন্য হৃদয়ের নিরব কান্না থামেনা।
এক সময় রুনাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। স্বামী আসিফ খুব ভালোবাসে রুনাকে। কিন্তু তার আর্থিক অবস্থা
তেমন ভালো না। আসিফের ঘরে রুনার জীবন চলে খুব কষ্টে। এর মধ্যে সে এক পুত্র সন্তানের মা হয়। প্রতি মুহূর্ত কাটে
তার তন্দ্রাচ্ছন্নের মতো। কোন কাজে মন দিতে পারে না। কোন ধ্যানে কোথায় যেন হারিয়ে যায় বারবার। অনিক কে সে
ভুলতে পারে না। তাকে দেখার জন্য তার মন ছটফট করে। রুনা বোঝে এখন অনিকের সঙ্গে দেখা করা ঠিক না। নিজের
মনকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করে।  তবুও পুরনো স্মৃতি তার পিছু ছাড়ে না। অনিকের কাছে আমি যতদিন ছিলাম। ও
হৃদয় জুড়ে আমি ছিলাম। আমাকে জুড়েই তখন ছিল ওর সমস্ত পৃথিবী। একদিন রুনা অনিক কে ফোন দেয়। নিজের
অবস্থা সম্পর্কে অনিক কে জানাতে চায় কিন্তু বাষ্প রুদ্ধ কন্ঠে কিছুই বলা হয় না। অনিক আমি তোমার ভালোবাসা
পেয়েও অবহেলায় হারিয়েছি। আমি যা করেছি তা ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নয়। তুমি ভালো থেকো। আর আমি জানি তুমি
এমনই একজন মানুষ সুখ তুমি গড়ে নিতে পারো। সুখ তোমার কাছ থেকে কখনোই দূরে থাকার নয়। অনিক রুনার কথা
শুনে বুঝতে পারে সে সুখে নেই। বুকের মাঝে হাহাকার করে ওঠে। সান্তনা দিতে চেষ্টা করে, জীবন যেমনই হোক মেনে
নাও।
অনিক আমি এখন সব মেনে নিয়েছি। তোমাকে হারানোর সুতীব্র ব্যথা ঝড়ো বাতাসের মতো কেন আন্দোলিত করে।
তোমার ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দেয়। একসঙ্গে আমাদের বাস না হলেও মনের সাম্রাজ্যে বসতি তোমার। আর যদি
কখনো কথা নাই হয় মনে করো না আমার মনে নেই তুমি। গড়িয়ে চলা সময়ের ঢেউ নাকি শ্রেষ্ঠ নিরাময়কারী। পরিশেষে
রুনা নিজের মনে সান্ত্বনা খুঁজে নেয়। সে অনিক কে আর কখনোই ফোন করে না। দেখা করারও চেষ্টা করে না। নিরব
নিস্তব্ধতার মাঝে প্রশমিত হয় কল্পনার আবেগ। রুনা ভাবে বাস্তব পরিমন্ডলই এখন শুধু তার আপন। আমার স্বামী আর
সন্তানই আমার পৃথিবী। রুনা স্বামী সন্তানের মাঝে নিজের পৃথিবী গড়ে নিতে চেষ্টা করে।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.