দেশ ও মানুষের কথা বলে

“অকাল প্রস্থান”

আগস্ট,১৫,২০২২

“সুলেখা আক্তার শান্তা”

মর্জিনা মেয়েকে খুঁজতে বের হয় একটা লাঠি হাতে নিয়ে। আপন মনে বকবক করে। মেয়েটার জ্বালায় আর বাঁচি না,
কোথায় থাকে কোথায় যায় কোন হদিস পাই না। আর ভালো লাগেনা। খুঁজতে খুঁজতে দেখে কামাল আর ফাহিমের সঙ্গে
খেলছে মায়া। ওরা মায়ার চেয়ে বয়সে ছোট হলেও খেলার সঙ্গী হিসেবে বেশ।
মর্জিনা চেঁচিয়ে কামাল আর ফাহিমকে বলে, এত বড় ডাঙ্গর পোলাপানের আবার খেলার শখ। মায়া মায়ের হাতে লাঠি
দেখে ভয়ে দৌড়ে পালায়। পিছন থেকে মর্জিনা মেয়েকে ডাকে, ফের এদিক ফের।
মায়ার সহজ উত্তর, না তুমি মারবা।
সেই ভয়ে যদি থাকে তায় বাড়ি থাইকা বের হইছস কেন? কামাল আর ফাহমি গাছের আড়ালে লুকিয়ে দেখে। মর্জিনা
দেখতে পেয়ে বলে, তগো আজ খাইছি। কতবার কইরা কইলাম তোরা আমার মাইয়ার কাছে আসবি না, হোনছস আমার
কথা?
কামাল আর ফাহিম একসঙ্গে বলে, আপনের মাইয়াই তো আমাগো ডাকে।
অয় ডাকলেও তোরা আর আসবি না। মর্জিনা মেয়েকে দেখতে না পেয়ে ভাবে, বাড়ি না এসে উপায় আছে? কতক্ষণ আর
না খেয়ে থাকবে। বাড়ি এলে তখন এর ঝাল মিটানো হবে। মেয়েকে বকতে বকতে সে বাড়ির পথ ধরে।
কিছুক্ষণ পরে মায়া এসে মাকে বলে, মা ক্ষুধা লাগছে খাইতে দাও।
পেটে টান পড়ছে, এখন আইছে খাইতে। আয় জন্মের খাওন খাওয়ামু তরে। মায়ের গর্জন তর্জন শুনে মায়া কিছুক্ষণ দূরে
দাঁড়াই থাকে। একটু পর স্বাভাবিক ভাবেই তার পরিসমাপ্তি ঘটে। মর্জিনা মেয়েকে ডাকে, আয় খাইয়া যা। ভাবে মেয়ে তার
এমনই। যতই বকে আর মারে তাতে কাজ হয় না। মায়া খেতে বসবে এমন সময় পাশের একটি বাচ্চার কান্না শুনতে পায়।
বাচ্চাটি ক্ষুধায় কাঁদছিল। মায়া নিজে না খেয়ে ভাতের থালাটা বাচ্চার কাছে এগিয়ে দেয়। আবার নিজ হাতে তুলে খাইয়ে
দেয় বাচ্চাটাকে। এমনি স্বভাবের সহজ সরল মেয়ে মায়া। তার শরীরের গঠন একটু ভারী। শরীরের ভারে চলাফেরা
করতে কষ্ট হয়। তাকে নিয়ে অনেকে হাসি ঠাট্টা করে। বলে, মুটি, মুটিকী। শুনে মায়া ক্ষেপে যায়। মায়ার সবচেয়ে কাছের
লোক হচ্ছে কামাল ও ফাহিম। তারা কখনো মায়াকে খেপায় না, খোঁটা দেয় না। মায়া ঘরে যা থাকে, কেউ চাইলে নিয়ে
দিয়ে দেয়। মায়া দয়া অন্তপ্রাণ। নিজের সাধ্যে যদি কুলায় কারো কোন সমস্যার কথা শুনলে আর না করে না। মায়ার মা
মেয়েকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। মেয়ে কিছু বোঝেনা, বিয়ে হলে স্বামীর ঘর করবে কিভাবে!
এক ভিক্ষুক মহিলা এসে বলে, মাগো ছিঁড়া কাপড় পইড়া আছে, আমারে একটা কাপড় দিবেন। শুনে মায়া মায়ের কাপড়
ঘর থেকে বের করে ভিখারিনীকে দিয়ে দেয়। মর্জিনা কাপড় দেখতে না পেয়ে বুঝে নেয় এটা তার মেয়ের কাজ। মেয়েকে
বলে, আর কত জ্বালাবি আমাকে! আমাদের অবস্থা কী ভালো? আমাদের কী আছে কী নাই তা দেখবি না! মায়ার দুই ভাই
দুলাল আর জামাল। ওরা বলে, মা ওর বিয়ে দিয়ে দাও। এমন বলদ নিয়া তুমি আর কত জ্বালা সইবা? শুনে মায়া কাঁদতে
কাঁদতে বলে, মা তুমি কিন্তু আমারে বিয়া দিবা না। মা কথাটা কানে না তোলায় বারবার একই কথা বলতে থাকে মায়া।
বলো মা তুমি আমার বিয়া দিবানা! দেখছো বলদা মাইয়ার কীর্তি, কানতে কানতে বুক ভাসাইয়া ফেলতাছে। তোরে বিয়া
দিমু না! তোরে দিয়া ঘরের খুঁটি দিমু।
মর্জিনা মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তিত। ঘটকের সঙ্গে কথা বলে। বোকাসোকা মেয়ে আমার, চলনসই একটা পাত্র দেখেন।
মেয়ের জন্য ছেলে দুটাকে বিয়া করাইতে পারতখছি না! বউরা কী আমার এই বলদ মেয়ের জ্বালা যন্ত্রনা সইবো? তাই বয়স
কম হলেও ছেলেদের বিয়ার আগেই মাইয়াটার বিয়া দিতে চাই। ঘটক মজিদ করিতকর্মা লোক। বলেন, আমার কাজেই

হলো ছেলে বিয়ে করানো আর মেয়ের বিয়ে দেওয়া। আপনি এ নিয়ে চিন্তা করেন না। আমি যে করেই হোক আপনার
মেয়ের জন্য পাত্র জোগাড় করার চেষ্টা করব। মর্জিনা দুশ্চিন্তা কিছুটা হালকা হয়। মায়ের কড়া শাসন বাইরে খেলতে
যাওয়া চলবে না। খেলার সঙ্গিরা এলে মায়া বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করে। মর্জিনা বলে, বাড়ি থেকে বের হবি না। ঘটক পাত্র
নিয়ে আইসা তোরে যদি মাঠে-ঘাটে খেলতে দেখে তাহলে বিয়া হইবো!
সঙ্গিরা বলে, মায়ার বিয়ে হয়ে গেলে মায়ার মতো খেলার সাথী পাবে না। শুনে মায়া বলে, ধুর বোকা আমি বিয়ে করলে
তো?  সঙ্গিরা সমস্বরে বলে, দেখিস চাচী ঠিকই তোর বিয়ে দিয়ে দিবে।
ঘটক মায়ার জন্য পাত্র নিয়ে আসে। মায়া যেমন হাবাগোবা পাত্রও তেমনি সাদাসিধা ধরণের। পাত্র বোরহানের সঙ্গে
মায়ার বিয়ে ঠিক হয়। মর্জিনা দীর্ঘশ্বাস সেরে বলে, যাক অবশেষে মেয়েটার জন্য একটা পাত্র জুটলো। মায়া বিয়ে ঠিক
হওয়া থেকে বিয়ের দিন পর্যন্ত একনাগাড়ে কাঁদে। তার এক কথা, মা এই বিয়ে বন্ধ করো। আমি বিয়া করব না। শেষ
পর্যন্ত উঠানে গড়াগড়ি করে আর চিৎকার করে কাঁদে। মা আমি এই বাড়ি ছেড়ে যাব না। আমাকে তুমি বিদায় করো না
মা। আমার কোথাও মন টিকবে না। মেয়ের কান্না দেখে মর্জিনা ও কাঁদে, মা তুই কাঁদিস না। কোন মেয়ে তার বাপের
বাড়ি সারা কাল থাকে না। সব মেয়েকেই তার স্বামীর বাড়ি যেতে হয়। মায়ার বিয়ে হয়। মায়ার বরপক্ষের সঙ্গে বিদায়
নেওয়ার মুহূর্তে সঙ্গিদের কান্নায় আরো করুণ হয়ে ওঠে।
মায়া শ্বশুরবাড়িতে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না। শাশুড়ির জ্বালা ননদের জ্বালা। শাশুড়ি গঞ্জনার সীমা ছাড়িয়ে গায়ে হাত
তোলা শুরু করে। শাশুড়ি ননদের নির্যাতন মায়া নীরবে সহ্য করতে থাকে। বোরহান কাজ কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বউ যে
জ্বালা যন্ত্রণার মধ্যে আছে সেটি তার উপলব্ধিতে আসে না। মায়া কষ্টের কথা কার কাছে বলবে। এক আছে মা। দুই ভাই
বিয়ে করে সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বোনের সংসারের খবর রাখার সময় তাদের নাই। ভাইরা বোনের খোঁজ রাখেনা সেই
খোটাও শাশুড়ির ননদের কাছে শুনতে হয়। শাশুড়ি কথায় কথায় খোটা মারে। দেখস না তোর ভাইরা কোন খোঁজ খবর
রাখে না। রুপা বলে, ওর বাপের বাড়ি কী আছে? দামরা গতর, বিয়া হইতে ছিল না আমার ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ওর
মা ভাইরা বাঁচছে। মায়া কখনোই কোনো কথ বলে না। লাঞ্ছনার পরিপেক্ষিতে আজ তার উপলব্ধি হলো বাপের বাড়ি কদর
না থাকলে স্বামীর বাড়িও মেয়েদের কদরে থাকে না। মায়া যে স্বামীর বাড়ি জ্বালা যন্ত্রণা কষ্টে আছে কখনোই সেটা মা
ভাইদের বলে না। বললে কী হবে, ভাইরা মায়াকে তেমন একটা কদর করে। তার সোজা সরল ভালো মানুষি তাকে পরিণত
করেছে তাচ্ছিল্যের বস্তুতে। ছোটবেলা থেকেই তাকে ডাকা হতো বলদ বলে। মায়া স্বামীর বাড়ি সেই যে এসেছে আর
যাওয়া আসা নাই। বিয়ের পর একবার গেছিল বাবার বাড়ি। বাবার বাড়ি থেকে কেউ নিতে আসে না বলে স্বামীর বাড়ির
কেউ যেতেও বলে না। আর স্বামী কাজ কর্মের ব্যস্ততায় অবসর করতে পারে না যে নিয়ে যাবে। দুই ভাইয়ের বউদের
কাছে তার মা ভালো নাই। মায়ের বয়স হয়েছে শরীর তার চলেনা।
মায়ার গর্ভে সন্তান আসে। সন্তান গর্ভে নিয়েই তাকে অনেক ভারী কাজ করতে হয়। ভাবে, এমন ললাট লিখন নিয়ে কেন
জন্মাতে হয় বউ-ঝিদের। স্বামী বোরহান অনাগত সন্তানের জন্য বউয়ের প্রতি খুব খুশি। শুধু বলে, কবে আমার ছেলের
মুখ দেখবো। আমাকে বাবা বলে ডাকবে।
মায়া বলে, ডাকবে। তোমাকে বাবা বলে ডাকবে আমাকে মা বলে ডাকবে। ঘর আমাদের আলোতে ভরে যাবে। পেটে হাত
দিয়ে সন্তানের নাড়াচড়া অনুভব করে। মাতৃত্বের সার্থকতা মায়াকে রোমাঞ্চিত করে। একদিন বোরহান আদর গলায় বলে,
তোমারে তো কখনো আমি কিছু কিনে দেই নাই। আমার সন্তানের খুশিতে খুশি হইয়া তোমারে একটা গলার চেইন দিমু।
মায়া স্বামীর দিকে পরিতৃপ্তির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, না আমার কিছু লাগবে না। তুমি তো আমার কাছে চাও নাই আমিই
খুশি হয়ে তোমারে দেবো।
বোরহান বউকে ডাকে, এদিকে আসো। মায়া স্বামীর কাছে আসে। বউয়ের ঘোমটা সরিয়ে গলায় চেন পরিয়ে দেয়।
তোমাকে তো খুব সুন্দর লাগছে। তুমি এটা কিনতে গেলা কেন? সংসারে এমনি কত খরচাপাতি।
রাখতো সংসারে খরচ, এটা থাকবোই। তার জন্য আমার বউকে কিছু দেওয়া যাবে না। আমারও তো ইচ্ছা হয় আমার
বউকে আমি কিছু দেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়া সংসারের কাজে লেগে পড়ে। শাশুড়ি আর ননদ দেখতে পায় মায়ার
গলায় চেন। শাশুড়ির বলে, দেখি দেখি তোমার গলায় এটা কি? ওমা চেন?
ননদ রূপা বলে, এটা পাইলা কই?

তোমার ভাই দিছে আমাকে।
দেখছো মা দেখছো আমার কিছু লাগবে সেটা দেখেনা। বউয়ের জন্য তোমার ছেলে চেন এনে দিয়েছে। মা আরো না জানি
কী কী দিছে! শাশুড়ির ননদের চোখমুখ কুঞ্চিত করে বলে, আর কী কী দিছে তোমারে বলো? মায়ার সহজ সরল উত্তর,
আর কিছু দেয় নাই। মায়া সংসারের কাজ শেষে শরীরটা একটু খারাপ লাগায় শুয়ে পড়ে। ক্লান্ততে ঘুমিয়ে পড়ে সে। তখন
শাশুড়ি আর ননদ মায়ার গলা থেকে চেন খুলে নেয়। মায়া ঘুম থেকে উঠে দেখে তার গলায় চেন নাই! খোঁজাখুঁজি শুরু
করে দেয়।
রুপা বলে, কী খোঁজ তুমি?
আমার চেন পাইনা।
শাশুড়ি ননদ অমনি শুরু করে চিল্লাচিল্লি। দেখছো কী দানবের দানব। ছেলে আমার চেনটা দিয়ে সারতে পারল না অমনি
সে চেন হারাই ফেলছে। মুখে যা আসে তাই বলতে শুরু করে। মায়া ভয় পায় স্বামী না জানি তাকে কী বলে। কিন্তু জানার
পরে বোরহান কিছুই বলেনা।
মায়ার ছেলে হয়। ছেলেটা দেখতে ফুটফুটে সুন্দর। ছেলের নাম রাখে সাব্বির। দাদী, ফুপু, বাবা-মা সবাই আদর করে
সাব্বিরকে। পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখে শিশুটি। সাব্বির হামা দিতে দিতে ধীরে ধীরে হাঁটা শিখে। সবাইকে ডাকে, দাদা-
দাদী, মা-বাবা, ফুপু। নিজেকে সার্থক মনে হয় মায়ার। সন্তান যেন সম্পদ হয়ে সংসারে মায়ের মূল্য নির্ধারণ করে।
বোরহান কাজে থেকে এসে ছেলেকে আগে আদর করে তারপরে খেতে বসে।
শাশুড়ি জলির শরীরটা তেমন ভালো না বিছনায় শুয়ে বসে থাকে। স্বামী কাজে গেছে মায়া তাড়াতাড়ি রান্না বসায়। কাজ
থেকে ফিরে এলেই যাতে খেতে দিতে পারে। রান্না করতে বসে দেখে লবণ নাই। রুপাকে বলে, লবণ নাই বলতো এখন কী
করি?
রুপা বকবক করে ওঠে। লবন নাই আমি কী করবো? তুমি গিয়া পাশের দোকান থাইকা আনতে পারো না। নাকি তাও
আমি শিখাইয়ি দিবো? বর্ষাকাল বাড়ির চতুরদিকে পানি।
রুপা তুমি তাহলে দেখো আমার ছেলেকে। রুপা বলে, আচ্ছা। রুপা নারকেলের পাতা কেটে সলা বের করছিল ঝাড়ুর
জন্য। দোকানে ভিড় ছিল মায়ার সদাই পাতি নিয়ে ফিরতে দেরি হয়। রুপা মনোযোগ দিয়ে হাতের কাজ করছিল।
ভাতিজার দিকে খেয়াল নাই। এই সুযোগে সাব্বির পাশের খাল দিকে এগিয়ে যায়। খালের পারে ঘাসফুল দেখে ধরতে হাত
বাড়ায়। অমনি পানিতে পড়ে যায় ভারসাম্য রাখতে না পেরে। কিছুক্ষণের মধ্যে ডুবে যায় ছোট্ট দেহটি। তখন আশেপাশে
কেউ ছিল না বলে এটা কারো নজরে পরেনা। মা এসে ছেলেকে না দেখতে পেয়ে খোঁজ করে। বাড়িতে না পেয়ে পুকুর ও
খাল পাড়ে যায়। খালেরর এক কিনারায় দেখে ছোট্ট একটা মানুষের পিঠ ভেসে আছে। মায়া তাড়াতাড়ি তুলে দেখে এ যে
তারই বুকের মানিক। বাবা সাব্বির বলে, মায়া একটা চিৎকার দিয়ে মূর্ছা যায়। শোকের ছায়ায় আঁধার হয়ে আসে
চারিদিক। বাতাসে হৃদয়বিদারক কান্নার শব্দ। ক্রন্দন আর বিলাপে ভরে উঠে চারিদিক। মায়া আর বোরহানের অন্তরের
হাহাকার কিছুতেই থামেনা। শান্ত হয় না তাদের মন। তারা কিছুতেই সন্তানের চাঁদ মুখখানা ভুলতে পারে না। মায়া
বারবার ছেলের কবরে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে। আমার বুকের মানিক ছাড়া আমি কেমনে থাকব। আমার এ কী কপালে লেখা
ছিল! কোল খালি কইরা মানিক আমার গেছে চইলা।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.