দেশ ও মানুষের কথা বলে

“চিরায়িত আলেখ্য”

আগস্ট,২৭,২০২২
“সুলেখা আক্তার শান্তা”

সময়ের সাথে মানুষের কত পরিবর্তন হয় আর তোর কোন পরিবর্তন হইলো না। তোরে কত বুঝাই
ভাইয়ের সংসারে না থাইকা বিয়ে-শাদী কর, নিজের স্বামী সংসার নিয়া থাক। কে শুনে কার কথা। ভাই
যখন বিয়ে শাদী করব তখন বুঝবি ঠেলা। দেখবি থালায় ভাত বাড়বি একদিক দিয়া আর চোখের
পানি ঝরাবি আরেক দিক দিয়া এই আমি বললাম!
শাহানা বলে, আমি আর বিয়ে শাদী বসুমনা। যতকাল বাঁইচা থাকি ভাইয়ের সংসারেই জীবন কাটাইতে
চাই। আর ভাইয়েরটা যাতে না খাইতে না হয় সেজন্য তো কাম কাজ করি।
চাচী মর্জিনা বিদ্বেষপরায়ণ স্বভাবের। ঠেস মেরে শাহনাকে বলে, এখন করস ভালো, বুড়া হইলে দেখবো
কে? মাইয়া মানুষের জীবন যায় কিছুকাল বাপের বাড়ি কিছুকাল স্বামীর বাড়ি। তুই পুরা কালই বাপের
বাড়ি থাকতে চাস?
রিজিয়া বলেন, ওনার আবার কি হইছে? সারাক্ষণ মাইয়াটার পিছনে লাইগাই থাকে। তোমার এই স্বভাব
কেন? কার সংসারে কী হইলো না হইলো তা নিয়া তোমার যত মাথা ব্যথা!
আমি কী দোষের কিছু কইছি? ভালো কথা কইলে মানুষ দোষ ধরে।
লাগবো না তোমার ভালো-মন্দ বলা। মেয়েটা কী আমার সাধে বাপের বাড়ি থাকে! বিয়া তো
দিয়েছিলাম। বিয়া কী কপালের দুঃখ ঘুচাইতে পারলো? জামাই বেটা ভালো ছিল না, সারাক্ষণ  থাকতো
জুয়া খেলা নিয়ে।  তয় ভালো পোলা পাইলে এখন মেয়ে বিয়ে দিমু।
ভালো পোলার আশা কর কেমনে? বিয়াইতা মাইয়া। কাম কাইজও তেমন পারেনা। দেখতেও তেমন
সিরিমান না।
রিজিয়া বলেন, তুমি এতক্ষণ বিয়া দেওনের জন্য দুন্যার কথা বললা। আর আমার মাইয়া নিয়া এখন
কও আরেক কথা!
শাহানা মাকে থামতে বলে, মা চাচী যা বলে বলুক।
মর্জিনা জিদ করে বলে, আমি কী বলছি যে তোমার গায়ে আগুন ধইরা গেল!
চাচী আপনি থামেন তো। শাহানা প্রসঙ্গ পাল্টাতে চায়। মাকে বলে, আমি যাই ডিম গুলা বেঁইচা আসি।
আইসা আবার রান্না করবো, ঘরে তেল নাই।
রিজিয়া মেয়েকে বলেন, টাকা হিসাব কইরা আনিস। তুই তো আবার হিসাব বুঝোস না। আবু-বলদি
একটা জন্ম দিছিলাম। বাজারে অনেক দোকান আছে শাহানা সব সময় কাশেমের দোকানেই যায়। সে
আবার দোকানের ভিড় থাকলে সবার আগে শাহানাকে সদাই দেয় যাতে শাহানার দাঁড়াই থাকতে না
হয়। দোকানে গেলে শাহানা প্রায়ই চাচতো ভাইয়ের ছেলে মনিরকে সঙ্গে নিয়ে যায়। দোকানের ভিড়-
ভাট্যার জন্য শাহানারা আড়ালে দাঁড়িয়ে মনিরকে দিয়ে ডিম বিক্রি করায়। ফেরার সময় মনিরকে
চানাচুর চকলেট কিনে দেয়। মনির খেতে খেতে ফুপুর হাত ধরে হাঁটতে থাকে। শিশু মনের পরিতৃপ্ত
শাহানার ভালো লাগে।  মনিরের কাঁধে হাত রেখে বলে, ভাতিজা আমার কী খুশি চকলেট চানাচুর

পাইয়া। মনির সোৎসাহে বলে, ফুপু তুমি যখনই দোকানে আসবা আমারে নিয়া আসবা। শাহানা উদগ্রীব
শিশুটির মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বস্ত করে, আনবো।
বাড়ি আইসা তাড়াতাড়ি রান্না বসিয়া দেয় শাহানা। রান্না শেষ হওয়ার আগেই কাজ থেকে খোকন বাড়ি
ফেরে। গোসল করে চুপচাপ শুয়ে থাকে। মর্জিনা চেঁচামেচি শুরু করে। এও সহ্য করা যায়! পোলাটা
কাজ থাইকা আইসা খাইবো। মাইয়াটা গেছে বেলা কইরা রান্না করতে।
রিজিয়া বলেন, অন্যের সংসারে তুমি এত বাধা হয়ে দাঁড়াও কেন? সংসার আলাদা, ভাত কাপড়
আলাদা। তারপরও এই সংসার নিয়া যত মাথাব্যথা তোমার!
মর্জিনা বলেন, মানুষের ভালোর জন্য কিছু বললে হইয়া যায় খারাপ। আমিও যে কী না, আগ বাড়িয়ে
কথা না বললে ভালো ঠেকি না।
শাহানা তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করে ভাইকে খেতে দেয়। খোকন বোনকে বলে, বাড়ি বসে কী কাজ
করিছ? বেলা করে রান্না করতে যাস?
শাহানা বলে, কত কাজেই তো করি কাজের কী আর শেষ আছে?

খোকনের রিপাকে পছন্দ, কখনো মুখ ফুটে বলেনি। টাকা পয়সা নামে দামে সবকিছুতেই রিপাদের
অবস্থা ভালো। অবস্থার ব্যবধানের কারণে খোকন সরাসরি  রিপাকে বলতে সাহস পায়নি, আমি
তোমাকে ভালোবাসি। খোকন নিজের মনের কথা বলার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। পরিচিতিরা বুঝতে
পারে রিপাকে খোকনের পছন্দ। জানলেও তার বুঝে রিপাদের যে অবস্থান তাতে খোকনের সঙ্গে আত্মীয়
করা সম্ভব না। খোকন কখনোই প্রকাশ করে না ভয়ে যদি এটা বাস্তবে বাস্তবায়িত না হয়। খোকন
অন্তরের ব্যথা অন্তরেই রেখে দেয়। খোকন নিজেকে সান্তনা দেয়, রিপা বড়লোক ঘরের সন্তান আমি
হয়েছি গরিব ঘরের। আমাদের সঙ্গে কী ওদের মিল হয়! মানুষের মন তো কত কিছুই চায়। রিপার বিয়ে
হয়ে যায়।
মর্জিনা খোকনকে বলে, তুই যে করেই হোক বোনটাকে তোর ঘাড়ের থিকা নামা। তখন দেখবি তোর
কাছে কত মানুষ মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। চাচী মর্জিনা মাঝে মাঝেই এ কথা বলে থাকে।
খোকন বলে, চাচী, বোনরে কই ফেলুম? ঠিক আছে, চাচী আপনি যখন বলছেন আমি ভেবে দেখবো।
মর্জিনা খোকনের বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লাগছে।
খোকন বোন শাহানার বিয়ের কথা মাকে বলে।
রিজিয়া ছেলের মুখের কথা শুনে বলেন, বোনের বিয়ে দিতে চাস বেশ ভালো কথা। কিন্তু তুই যেমন
করতেছিস মনে হয় শাহানা তোর বাড়া ভাতে পানি দিছে।
মা তোমার মেয়ের লাইগা আমার বিয়া তো ঠেকাইয়া রাখতে পারি না! সংসারে এতো ঝামেলা থাকলে
আমার জন্য কোন ভালো বিয়ের ঘর আসবো? যখন শুনবে বিয়ে হইছিল সেই বোন আমার ঘাড়ের
উপর!
তুই তোর বিয়ে নিয়ে ভাবিস? একবারও তো তুই বোনটার কথা ভাবোস না।
আমি কী ভাববো? ওর জীবন নষ্ট হইছে এখন আমার জীবনটাও কী নষ্ট হইব! তুমি তোমার মেয়ের
বিয়ে দাও আমার ঘাড়ের উপর থেকে নামাও।

মর্জিনা হেসে বলে, হ্যাঁ এমনই বলবি। তোর পথ পরিষ্কার রাখ। পরের মাইয়া আইসা ঝামেলা পোহাইতে
চাইবো না। তোর বোনরে নিয়া তোর সংসারে লাগবো দ্বন্দ্ব। আমি তোর মাকে এত বলি সে কোন কথা
কানেই নেয় না। কোন বিয়ের প্রস্তাব আসলে তারা ভেবেচিন্তে করে দেখবে ছেলের বোন আছে একটা
ঘরে।
শাহানা ভাইয়ের সংসারে থাকলেও চিন্তা করে সাবলম্বী থাকার। সম্পুর্ন ভাইয়ের গলগ্রহ যাতে হতে না
হয় সে জন্য চিন্তা করে। কিছু যেতে আয় হয় সেই কাজে ব্যস্ত থাকে। হাঁস মুরগি পালন, প্রতিবেশীর
কাঁথা সেলাই, জমিতে ঝড়া ধান উঠানো নানা কাজে নিয়োজিত থাকে। মর্জিনা বলে, পোড়ানী আর কত
পুড়বি? ভাই বিয়ে করে নাই তার আগেই তোকে দেখতে পারেনা। বোনের গায়ে হাত তোলে। বড় বোন
বইল্যা তোকে মাইন্য করে না। আর শোন তুই তো কিছু টাকা আলাদা জমাইতে পারিস? সবই তো তুই
সংসারে ঢালস এতে নাম হইবে! আমার কাছে কিছু করে টাকা জমা রাখিস।
চাচী, ভাইটা তো ছোট বোঝেনা।
আর ছোট ছোট বলিস না! যে এখন বিয়ে করবে তুই তাকে বলছিস ছোট?
রিজিয়া শাহানার বিয়ের জন্য লোকজনকে বলেন, মেয়েটার জন্য তোমরা ছেলে দেখো, আমার শাহানার
কোন গতি করতে পারলে মনে শান্তি পাইতাম।
শাহানা মাকে বলে, মা বিয়ে-শাদী করমু না। কাজকর্ম কইরা আমার এই একটা পেট চইলা যাইবো। এই
ভাবেই জীবনটা পাড়ি দিমু।
তোর ভাই তোরে সংসারে রাখতে চায়না। খোকন বিয়ে করে নাই তার আগেই সে বউয়ের চিন্তায়
অস্থির আর বিয়ে করলে কী করবো!
শাহানার বিয়ে হয় বৃদ্ধ হাকিমের সাথে। হাকিম অসুস্থ। তেমন কাম কাজ করতে পারে না। প্রথম স্ত্রী
মারা গেছে। সেই ঘরের পাঁচজন ছেলে মেয়ে আছে। মানুষ হিসাবে সংসারের আয় উপার্জন কম।
শাহানাকে আনা হয়েছে অচল সংসার সচল করতে। ‌অসুস্থ হাকিম কাজ শেষে বাজার করে আনে। সঙ্গে
সঙ্গেই রান্না বসিয়ে দেয় শাহানা। ছেলেমেয়েরাও অধীর অপেক্ষায় থাকে কখন রান্না শেষ হবে, কখন
খাবে। শাহানা রান্না করে, চুলের কাছে বসে হাকিম ভাবতে থাকে। শাহানা স্বামীকে বলে, কী চিন্তা
করেন? হাকিম গালে হাত দিয়ে বলে, গরিবের ভাবনা যা তাই নিয়ে ভাবছি। ধনীর যেমন টাকা-পয়সা
সম্বল থাকে। গরিবের সম্বল অভাব এই সম্বল কখনোই শেষ হয় না। তোমারে টাইনা আনলাম এর
ভিতরে। আর কিছু না পারি সেই সম্বলের ভাগীদার করলাম তোমারে। পরদিন হাকিম কাজে যায়,
ফিরে লাশ হয়ে। কর্মস্থলে হাকিমের মৃত্যু হয়। স্তব্ধ শাহানা শুধু উপর দিকে একবার তাকায়। অনেক
ভাগ্যহত নারীর জীবনের মতো শাহানার জীবনেও অলক্ষ্যে অবহেলায় যবনিকা নেমে আসে একদিন।

www.bbcsangbad24.com

Leave A Reply

Your email address will not be published.