ফেব্রুয়ারী,১৫,২০২৬
আবু হানিফ রানা:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের রুদ্ধশ্বাস রাজনৈতিক পরিবেশ, ভোটাধিকার হরণ এবং গণতান্ত্রিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে মুন্সীগঞ্জের মানুষ এক অভূতপূর্ব ‘ব্যালট বিপ্লব’ সম্পন্ন করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সাথে রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক ‘গণভোট’—এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ যে অদম্য সাহসিকতা, দৃঢ়তা, পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, তা আজ সারা দেশের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত


মুন্সীগঞ্জের প্রতিটি জনপদ, গজারিয়া থেকে মুন্সীগঞ্জ আর সদর থেকে টংগীবাড়ি,লৌহজং, শ্রীনগর,সিরাজদীখান সর্বত্রই ছিল বিজয়ের উল্লাস।মুন্সীগঞ্জ-১ মুন্সীগঞ্জ-২ ও মুন্সীগঞ্জ ৩ আসনের চূড়ান্ত ফলাফল এবং গণভোটের রায় বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ অঞ্চলের মানুষ কেবল প্রার্থী নির্বাচিত করেনি, বরং তারা একটি নতুন বাংলাদেশের রূপরেখাকে ‘হ্যাঁ’ বলে আলিঙ্গন করেছে।
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও রিটার্নিং অফিসার সৈয়দা নুরমহল আশরাফী এবং পুলিশ সুপার (এসপি) মোঃ মেনহাজুল আলম পিপিএম যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা মুন্সীগঞ্জবাসী দীর্ঘকাল মনে রাখবে। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও সেনা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছিল।
জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকগণ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারগণ, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ এবং বিভিন্ন বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি সুশৃঙ্খল চেইন অব কমান্ড কাজ করেছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পুলিশ,
সেনা বাহিনী, বিজিবি, র্যাব,আনসার এবং বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটগনের সমন্বিত টহল ভোটারদের মনে এই বিশ্বাস জাগিয়েছিল যে, ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’। এই আস্থার ফলেই মুন্সীগঞ্জের ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
আসন নং ১৭১, মুন্সীগঞ্জ-১ (শ্রীনগর ও সিরাজদীখান )আসন নং ১৭২ মুন্সীগঞ্জ-২ (টংগীবাড়ি-লৌহজং) আসন নং ১৭৩ মুন্সীগঞ্জ-৩ ( সদর-গজারিয়া) আসনে এবার লড়াই ছিল মূলত আদর্শিক। এই আসনগুলোতে হাড্ডা হাড্ডি লড়াইয়ের মাধ্যমে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা ।
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে সংবিধান সংস্কারের ‘গণভোট ২০২৬’। মুন্সীগঞ্জের ৩ টি আসনেই ভোটাররা বিপুলভাবে ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোট দিয়ে বর্তমান রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
এই গণভোটের ফলাফল প্রমাণ করে যে, মুন্সীগঞ্জের মানুষ একটি বৈষম্যহীন সমাজ এবং সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা চায়। জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে যে ‘জুলাই চার্টার’ তৈরি করা হয়েছে, তার প্রতি এই বিশাল সমর্থন আগামীর সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যাপক নৈতিক শক্তি যোগাবে।
ভোটকেন্দ্রে আসা সাধারণ মানুষের চোখেমুখে ছিল হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার আনন্দ। মুন্সীগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সি মোহাম্মদ মনির হোসেন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর আমরা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারিনি। আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার বুক ফুলিয়ে কেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছি। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক,
পুলিশ সুপার ও সেনাবাহিনীকে স্যালুট জানাই। তাঁদের নির্ভীক ভূমিকার কারণেই গত বৃহস্পতিবার মুন্সীগঞ্জের কোন সহিংসতা ছাড়াই এত সুন্দর ভোট হলো।
মনির হোসেনের মতো হাজারো মানুষের এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশই ছিল নির্বাচনের প্রকৃত সার্থকতা। নারী ভোটারদের উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। গৃহবধূ থেকে শুরু করে কর্মজীবী নারী সবাই উৎসবের আমেজে কেন্দ্রে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
মুন্সীগঞ্জের এই নির্বাচন কেবল সংসদ সদস্য নির্বাচন করার প্রক্রিয়া ছিল না; এটি ছিল জনগণের লুপ্ত অধিকার পুনরুদ্ধারের এক মহোৎসব। মুন্সীগঞ্জ-১ মুন্সীগঞ্জ-২ মুন্সীগঞ্জ ৩ আসনে বিএনপির বিজয় এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর জয়জয়কার মুন্সীগঞ্জের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী এবং পুলিশ সুপার মোঃ মেনহাজুল আলম পিপিএম যে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার নজির স্থাপন করেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। মুন্সীগঞ্জের মানুষ এখন একটি প্রত্যাশা নিয়ে ঘরে ফিরছে যে ভোট তারা গত বৃহস্পতিবার শান্তিতে দিতে পেরেছে, সেই ভোটের মর্যাদা যেন আগামীর উন্নয়ন ও সুশাসনে প্রতিফলিত হয়।
ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জে যে নতুন ভোরের সূচনা হলো, তা সারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
www.bbcsangbad24.com



